নদীতে মাছ শিকার করেই চলে সংসার। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও জেলে কার্ড না থাকায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভোলার হাজার হাজার প্রকৃত জেলে। মাছ শিকারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলায় উপকূলজুড়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন জেলে পরিবারের সদস্যরা। একদিকে নদীতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে সরকারি সহায়তা না পাওয়া দুই সংকটে অনাহার ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে অনিবন্ধিত জেলেদের। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অথচ বছরের পর বছর মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করলেও তালিকায় নাম না থাকায় সরকারি সহায়তা মিলছে না তাদের।
ভোলা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সরকারি নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ জন। এর বাইরে রয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি অনিবন্ধিত জেলে। নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল পেলেও অনিবন্ধিত জেলেদের অধিকাংশই সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল এসব পরিবারের জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
ভোলা সদর উপজেলার সোনাডগী গ্রামের জেলে জাকির হোসেনের জীবনের গল্পও একই রকম। মাছ শিকার করেই তিন মেয়েকে নিয়ে তার সংসার চলে। ছোটবেলা থেকেই এ পেশায় যুক্ত থাকলেও এখনও জেলে কার্ড পাননি তিনি। ফলে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কোনো সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। সংসারের খরচ মেটানো ও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে জাকির হোসেন বলেন, মাছ ধরা ছাড়া তার আয়ের আর কোনো পথ নেই। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় থেকেও জেলে কার্ড না থাকায় সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার চালানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তেঁতুলিয়া নদীর জেলে মোফাজ্জল মাঝিও একই অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, যাদের বংশে কখনও মাছ ধরার পেশা ছিল না, তাদের কেউ কেউ জেলে কার্ডের মাধ্যমে সরকারি চাল পাচ্ছেন। অথচ প্রকৃত জেলে হয়েও তারা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে প্রকৃত জেলেদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া এলাকার মাছ ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন বলেন, নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি সহায়তা পাওয়ায় কিছুটা হলেও সংকট সামাল দিতে পারছেন। কিন্তু অনিবন্ধিত জেলেদের পরিবারগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। মাছ ধরতে না পারা এবং কোনো সহায়তা না পাওয়ায় তাদের পক্ষে দৈনন্দিন খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোলার ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির নেতা আল মামুন বলেন, জেলেদের মধ্যে সহায়তা বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত জেলেদের অনেকেই কার্ড না থাকায় সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে প্রকৃত জেলে নন এমন ব্যক্তিদের কেউ কেউ সহায়তা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে তালিকাভুক্ত করা এবং সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজল কুমার দাস বলেন, বর্তমানে নিবন্ধিত জেলেদের সরকারি চাল দেওয়া হচ্ছে। অনিবন্ধিত জেলেদেরও সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হুসাইন বলেন, বিদ্যমান জেলে কার্ডের তালিকা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যারা এখনও তালিকাভুক্ত হননি, তাদের দ্রুত কার্ডের আওতায় এনে সরকারি সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
