রংপুরের পীরগঞ্জে পৌরসভার নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের ছাদ ধসে পড়ে দুই শ্রমিক নিহতের ঘটনায় পৌরসভার সচিবসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে নিহত শ্রমিক আছাদুলের বাবা ঠান্ডা মন্ডল বাদী হয়ে পীরগঞ্জ থানায় এ মামলা করেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকেই জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার আরাজী গঙ্গারামপুর এলাকায় ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মাণাধীন পৌর ভবনের ছাদের সাটারিং ভেঙে পড়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে কাজ করার সময় সাটারিং ধসে নিচে চাপা পড়ে ১৩ জন শ্রমিকের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ঠান্ডা মিয়ার ছেলে আছাদুল (২৫) এবং রংপুরের স্থানীয় বাসিন্দা শিহাব (২২)—এই দুই শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করেন। দুর্ঘটনায় আরও চার থেকে পাঁচজন শ্রমিক আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে পীরগঞ্জ পৌরসভার সচিব আবদুর রহিমকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলায় পৌরসভার প্রকৌশলী, মূল ঠিকাদার, সাব-ঠিকাদার ও ভবন তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিসহ মোট ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে প্রধান আসামিসহ অন্যরা গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পীরগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক জানান, মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও এর দায়দায়িত্ব নির্ধারণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান স্বাক্ষরিত আদেশে রংপুরের অতিরিক্ত জেলা এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা প্রকৌশলী এবং সদস্যসচিব হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী। পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল বাকীউল বারী জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ভিশন ২০২০’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করছিল। তবে শুরু থেকেই কাজে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্যমতে, সাটারিংয়ে অত্যন্ত পুরোনো ও নিম্নমানের বাঁশ-কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল এবং অতিরিক্ত ওজন সহ্য করতে না পেরেই তা ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া কাজ চলাকালীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা পৌরসভার কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিংবা তদারককারী প্রকৌশলীর উপস্থিতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা ও নিহত শ্রমিকদের পরিবার। দ্রুত এই অবহেলার সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
