গত এক যুগ থেকে ঘাটতির বৃত্তেই আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে রাজস্ব ঘাটতি আর মেনে নেওয়া হবে না। অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে নতুন কৌশল সামনে রেখে রাজস্ব আদায়ে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এনবিআর একগুচ্ছ কর্মকৌশল নির্ধারণ করে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তারা এসব কর্মকৌশল তুলে ধরেন। বৈঠকে সরকারি ব্যয়ের চাহিদা পূরণে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ব্যবধান কমাতে গৃহীত পদক্ষেপ এবং সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়েও বিস্তারিত উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
চলতি অর্থবছরে এনবিআর তিনটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হিসাব কষেছেন। এগুলো হলো–রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনর্বহাল) এবং রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)।
আরও পড়ুন
পুনরুদ্ধার কৌশলের আওতায় রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুনর্বহাল কৌশলের মূল লক্ষ্য করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব পরিবেশ তৈরি করা। পুনর্গঠন কৌশলের আওতায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছায় কর পরিপালন নিশ্চিত করে রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আয়কর ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা এবং শুল্ক ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায় করতে হবে।
আরও পড়ুন
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব খবরের কাগজকে বলেন, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছে। এরই মধ্যে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নির্দেশে এনবিআর রাজস্ব আদায়ের কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে। এসব কর্মকৌশল সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
কর্মকৌশলে চলতি অর্থবছরে আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে ১০ শতাংশ নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কষেছে এনবিআর।
আরও পড়ুন
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টলিজেন্স সেল (সিআইসি), আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ, আইআইসি এবং কর সার্কেলের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকৌশলে উল্লেখ আছে, ‘আয়কর আইনের ২১২ ধারায় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে ১ হাজার কোটি টাকা এবং বিলম্বে আয়কর রিটার্ন জমা খাতে ৫০০ কোটি টাকা আদায়ে হিসাব করা হয়েছে। এ ছাড়া নীতিগত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য ৫ শতাংশ করহার পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রগতিশীল করহার চালুর মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ে হিসাব করা হয়েছে।’
এনবিআরের কর্মকৌশলে আরও উল্লেখ আছে, ‘বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। করদাতাদের জন্য টার্নওভার কর চালুর মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী করদাতাদের আয়কর রিটার্নের সঙ্গে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও হিসাবের বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করে ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
কর্মকৌশলে উল্লেখ আছে, ‘ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা (বিজনেস-টু-বিজনেস) মডেলে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে উৎসে কর আদায়ের মাধ্যমে ৭ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। আবাসন খাত থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা এবং জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য মূলধনি সম্পদ বিক্রি থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর নিয়মিত করহার প্রয়োগ করে ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ে প্রত্যাশা করছে এনবিআর।’
কর্মকৌশলে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি ও পরিপালনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের (এডিপি) বাস্তবায়ন বাড়ার ফলে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিড়ি ও সিগারেটসহ তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
কর্মকৌশলে বলা হয়েছে, ‘ভ্যাট বিভাগের লক্ষ্য, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার ৫০ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে অনিষ্পন্ন মামলার অন্তত ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তি করা।’
কর্মকৌশলে শুল্ক খাতে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, ‘চলতি অর্থবছরে শুল্ক খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বকেয়া রাজস্ব আদায়, গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রতিরোধমূলক অভিযান, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা, নিলাম, আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণ, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং স্থগিত রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা থেকে ৫০০ কোটি টাকা, নিলাম থেকে ৫০০ কোটি টাকা, আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং স্থগিত রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
