Published on
:
3 min read
মহম্মদ মহসিন, জগৎবল্লভপুর
পুজোবাড়িতে কাঁসরঘণ্টা বাজছে। ঢাকের বোল আর ধূপের গন্ধে মাতোয়ারা সবাই। ঠাকুরদালানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কিছুক্ষণ পরেই বলিদান হবে। এমন সময়ে ঘটল সেই দুর্বিপাক। পরম ধার্মিক প্রধান পুরোহিতের নজর গেল বলির জন্য নির্দিষ্ট ছাগশিশুটির প্রতি। তিনি দেখলেন, একটি বাঁশের গোড়ায় বাঁধা ছাগশিশুটি পরম নিশ্চিন্তে পুজোর জন্য রাখা বেলপাতা চিবচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে প্রাণ কেঁদে উঠল পণ্ডিত রাধাগোবিন্দ ভট্টাচার্যের। তিনি গৃহকর্তা তিনকড়ি কুকড়ি মশাইকে ডেকে হাত ধরে কেঁদে বললেন, 'বাবা, এই ছাগশিশু নিষ্পাপ। এই শিশুকে আমি কিছুতেই বলি হতে দিতে পারি না। মা কখনও সন্তানের রক্ত চান না।'
প্রধান পুরোহিতের এ হেন আর্জিতে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল গৃহকর্তার। তিনি ছুটে গেলেন তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্রবধূর কাছে পরামর্শ নিতে। ভেঙে পড়ে তিনি জানতে চাইলেন, 'তোমার কী মত, বলো মা।' পুত্রবধূ শ্বশুরকে অভয় দিয়ে বললেন, 'বাবা, ঠাকুরমশাই ভুল বলেননি। এই নিষ্ঠুর নিয়ম উন্মাদনা ছাড়া কিছু নয়।' এইটুকু অভয়বাণীতেই সব দ্বিধাদ্বন্দ দূর হয়ে বন্ধ হলো বলি। সেই থেকে হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের মুন্সিরহাটের বল্লভবাটি গ্রামের ঘোষবাড়ির পুজোয় আর বলিদান হয় না। ১৯৬৮ সালের অর্থাৎ ৫৮ বছর আগের এই ঘটনা সবিস্তারে জানালেন পরিবারের বয়স্ক সদস্য রঞ্জিতকুমার ঘোষ। অতীতের স্মৃতি রোমন্থনে এই বয়সেও দু'চোখ বেয়ে জলের ধারায় সিক্ত হলেন বৃদ্ধ।
বল্লভবাটির ঘোষবাড়ির নবপর্যায়ের এই পুজো এবার ৭৬ বছরে। সাজানো-গোছানো স্থায়ী দুর্গাদালানে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বসেছিলেন বাড়ির প্রবীণ সদস্য রঞ্জিতকুমার ঘোষ। বাড়ির পুজোর পুরোনো দিনের নানা স্মৃতিচারণায় রঞ্জিতের খেই ধরিয়ে দেন পাশে বসা নাতনি লোপামুদ্রা। দুর্গাদালানের বারান্দায় নিপুণ হাতে মৃৎশিল্পী গড়ছেন দুর্গাপ্রতিমা।
রঞ্জিতকুমার জানালেন, ১৯৫১ সালে এই পুজো শুরু করেন তাঁর পিতা তিনকড়ি কুকড়ি। জোতজমি সামলানোর পাশাপাশি তাঁর ছিল কলকাতার ব্যবসা। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যবসা বিপর্যস্ত। নানা পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত। সে সময়ে কলকাতার টোলে পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাঁদের পরামর্শে দুর্গাপূজো শুরু করেন। যদিও অতীতে এই পরিবারে দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। ছিল পাকা দুর্গাদালান। তখনও পুজোর সময়ে বলিদান প্রথা চালু ছিল। সপ্তমী ও অষ্টমীর দিন একটি করে ছাগবলি হতো। নবমীর দিন দু'টি ছাগ ও একটি ভেড়া বলি হতো। মুন্সিরহাট এলাকা সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘোষ পরিবারে এক সময়ে খুবই আর্থিক স্বাচ্ছল্য ছিল। শুধু তাই নয়, তাঁদের অনেক দানধ্যান এখনও বহু মানুষ স্মরণ করেন। এখন পরিবার অনেক বড় হয়েছে। অনেক শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে নানা স্থানে। তাঁদের অনেকেই বাইরে থাকেন। তবে পুজোর সময়ে সবার উপস্থিতিতেই ঘোষ পরিবারের পুজোর আনন্দের ধারা আজও বহমান।
ঘোষবাড়ির পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় জন্মাষ্টমীতেই। সে দিন প্রতিষ্ঠা করা পুকুরের মাটি তুলে রাখা হয় প্রতিমা গড়ার জন্য। পাশাপাশি, কাঠামোর পুজোও হয় ওই দিন। এক সময়ে পুজোর একমাস আগেই দুর্গাপুজোর গঙ্গাজল হাওড়া থেকে বড়বড় জালায় ভরে মুটিয়ার মাথায় হাওড়া ময়দানের মার্টিন স্টেশনে ছোট রেলগাড়িতে তোলা হতো। তার পরে মুন্সিরহাট স্টেশনে তা নামিয়ে, ফের মুটিয়ার মাথায় এসে পৌঁছত পুজোবাড়িতে। পুজোর চারদিনই অতিথি অভ্যাগতদের জন্য বসত ভিয়েন। ভোজের পংক্তি অবারিত ছিল সবার জন্য। এখন নেই সে জৌলুস। তবু ঐতিহ্যের অনুসারী হয়ে পুজো চলে আসছে। সেকালে গ্রামে ছিল না বিদ্যুতের আলো। হ্যাজাকের আলোয় চতুর্দিকে ঘন আঁধারের মধ্যে পুজোবাড়ির আনন্দে মেতে উঠতেন গ্রামের সবাই।
পূজোর জোগাড় শুরু হয় চতুর্থী থেকে। প্রতিমার চূড়ান্ত সাজ সম্পন্ন হলে, ঠাকুরদালানের বারান্দা থেকে পুজোর ঘরে প্রতিমাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরই মধ্যে পঞ্চমীতে পুরোহিতগণ ও ঢাকিরা উপস্থিত হয়ে যান। জোগাড়ের ঘর, লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, সব ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করা হয়। ষষ্ঠীতে বোধন আর দেবীর চক্ষুদান। সপ্তমীর সকালে ঢাক, কাঁসর-ঘণ্টা-সহ বাড়ির এয়োদের তত্ত্বাবধানে পুরোহিতগণ নবপত্রিকাকে স্নানের জন্য নিয়ে যান বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, চাঁদনি পুকুরের ঘাটে। সেখানে পুজো এবং নবপত্রিকা স্নান সম্পন্ন হলে, পুরোহিতের কাঁধে নবপত্রিকা নিয়ে দুর্গামণ্ডপে ফেরা হয়। বলিদান বন্ধ হওয়ার পর থেকে পুরোহিতের পরামর্শে সপ্তমীতে শুরু হয় মধ্যরাত্রির পুজো।
পুজোয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান সন্ধিপুজো। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে সন্ধিপুজোর বিধি। বড়সড় কাঠের গোল বারকোষ জুড়ে সাজানো হয় চাল, নারকেল নাড়ু ও নানা ফলমূল-সহ মিষ্টান্নের সমাহারে বিশাল নৈবেদ্য। তার চারপাশ জুড়ে ১০৮ প্রদীপ জ্বেলে ১০৮টি পদ্ম মায়ের পায়ে নিবেদন করা হয়। নবমীতে হয় কুমারী রূপে মায়ের পুজো। দশমীতে দর্পণে বিসর্জনের পরে শুরু হয় মাকে বিদায় বরণের প্রস্তুতি। রাতে ঠাকুর বিসর্জনের যাত্রার আগে এয়োরা বিষণ্ণ হৃদয়ে প্রতিমা বরণ করেন। আসছে বছর আবার মায়ের আগমনের ধ্বনিতে শুরু হয় বিদায়যাত্রা।