টানা ২৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে মুক্ত করা হয়েছে। ক্যাম্পাস ছাড়ার আগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাকে আর কখনো ‘ক্যাম্পাসে ফেরা যাবে না’ শর্ত দেন।
পরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের সহায়তায় ক্যাম্পাস ছাড়েন উপাচার্য। প্রাথমিকভাবে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এর আগে বিকাল সোয়া ৫টায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন।
উপাচার্য ভবনের নিচতলায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার কথা বলেছেন। তাকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।’
এ সময় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, ‘এখানে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উপস্থিত আছেন। আমরা জানতে চাই, আপনারা কখন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য থাকবেন? আপনারা কি শুধু সেই ভিসিকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছেন, যিনি বহিষ্কৃতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন? তিনি এই ক্যাম্পাস থেকে আজ যেতে পারবেন ঠিক একটি শর্তে—তিনি আর কখনো এই ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন না।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে কড়া পুলিশ পাহারায় সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় উপাচার্য এবং তার সঙ্গে আটকে পড়া ছাত্রদল নেতাদের বের করে আনা হয়। পরবর্তীতে অবরুদ্ধ সবাইকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ সময় গণমাধ্যমকে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমান শিক্ষার্থীরাও পরিস্থিতি বুঝেছে, তারা যথেষ্ট সচেতন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও উপাচার্যের সুচিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। মূলত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই আমি এবং জেলা প্রশাসক আজ এসেছি। আলোচনার পর শিক্ষার্থীরাও পরিস্থিতি উপলব্ধি করেছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি। আগে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত হোক, এরপর সার্বিক পরিস্থিতি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।’
এর আগে সোমবার সকালে চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা বেলা ১২টার মধ্যেই তাকে ক্যাম্পাস ত্যাগের আলটিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ে ক্যাম্পাস না ছাড়ায় প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এতে টানা অবরুদ্ধ অবস্থায় ভেতরের কয়েকজনসহ উপাচার্য নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অবরুদ্ধ অবস্থায় উপাচার্য গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘সোমবার রাত ২টায় পুলিশের মাধ্যমে সামান্য খাবার এসেছিল, সেটাই আমরা খেয়েছি। এখানে আটকে থেকে প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হয়েছে, রাতে ঘুমাতে পারিনি। ভেতরে অনেকেরই শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপাচার্য আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে চুয়েটের চিকিৎসা কেন্দ্রের একটি দলকে ভবনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। সেখানে উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মো. সাহাবউদ্দিন এবং রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. টিবলু কান্তি দে।
এদিকে চুয়েটের চলমান সংকট নিরসন ও শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন ঢাকায় অবস্থানরত চুয়েটের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। এছাড়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শিক্ষার্থীরা।