আজকাল ওয়েবডেস্ক: নাগরিকদের অজান্তেই মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং জিপিএস স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন শক্তিশালী জ্যামার কিনতে বিপুল অর্থ খরচ করেছে দিল্লি পুলিশ, আর তা নিয়েই এখন দানা বাঁধছে বড়সড় বিতর্ক। তথ্য জানার অধিকার (আরটিআই) আইনের আওতায় সম্প্রতি পেশ করা একগুচ্ছ আবেদনের জবাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে ৩৪টি সিগন্যাল জ্যামার কিনতে প্রায় ১৬১ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছে। কোনও খোলা দরপত্র ছাড়াই সরকারি সংস্থা ইলেকট্রনিক্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইসিআইএল)-এর থেকে এই সমস্ত আধুনিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি হল গাড়িতে বসানো কনভয় জ্যামার, যা ২০ থেকে ৬ হাজার মেগাহার্টজ পর্যন্ত তরঙ্গের বিস্তারে ফোন, ওয়াই-ফাই এবং জিপিএস সংযোগ নিমেষে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম। বাকি চারটি হল ড্রোন প্রতিরোধের জন্য বিশেষ ‘স্মার্ট জ্যামার’, যার প্রতিটির দাম পড়েছে ৫ কোটি ৭১ লক্ষ টাকারও বেশি।
তবে বিপুল অর্থব্যয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে এই সরঞ্জামগুলোর ব্যবহার ও আইনি বৈধতা নিয়ে। তথ্যের অধিকারের জবাবে দিল্লি পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে। পুলিশের প্রভিশনিং অ্যান্ড লজিস্টিকস (পিঅ্যান্ডএল) শাখা জ্যামারের সংখ্যা ও খরচের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিলেও, যে নিরাপত্তা শাখার জন্য এগুলো কেনা হয়েছে তারা কোনও তথ্যই প্রকাশ করতে চায়নি। ‘ভিভিআইপি নিরাপত্তা’ এবং অত্যন্ত গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তারা এড়িয়ে গেছে কারা এই জ্যামার চালু করার ক্ষমতা রাখেন কিংবা অতীতে কতবার তা ব্যবহার করা হয়েছে। কেবল জানানো হয়েছে যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অপ্রকাশিত নিরাপত্তা নির্দেশিকা ‘ইয়েলো বুক’ এবং হুমকির মাত্রা অনুযায়ী ভিআইপিদের এই সুবিধা দেওয়া হয়। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম জেলা পুলিশ কোনও নির্দেশিকা থাকার কথাই অস্বীকার করেছে এবং জ্যামার সংক্রান্ত নথি দেখতে আবেদনকারীকে সরাসরি থানায় এসে তল্লাশি করার বার্তা দিয়েছে।
এই অস্বচ্ছতা আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ ভিআইপি কনভয়ের জন্য তৈরি এই জ্যামারগুলো গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা চলছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক আচমকা গায়েব হয়ে যাওয়ার পেছনে পোর্টেবল জ্যামারের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও শুনানি চলছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল, গাড়িতে নিয়ে ঘোরা এই ধরনের শক্তিশালী জ্যামার সক্রিয় থাকলে সাধারণ নাগরিক তো বটেই, জরুরি আপৎকালীন নম্বর ১১২-এ ডায়াল করা কিংবা অ্যাম্বুল্যান্স ডাকাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ এই জ্যামার চালালে জরুরি পরিষেবা কীভাবে বজায় রাখা হবে বা সাধারণ মানুষের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তার কোনও সমীক্ষা বা সুস্পষ্ট জবাব দিল্লি পুলিশের কোনও শাখার কাছেই মেলেনি। দরপত্র ছাড়া কোটি কোটি টাকা খরচ এবং প্রকাশ্য নীতি ছাড়াই সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার এই ক্ষমতা নিয়ে তাই এখন জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
