বিক্ষোভের অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। লিমোজের সিটি হলে অগ্নিসংযোগ, মার্সেইয়ের সিটি হলে ভাঙচুর এবং লিওঁর পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। রয়টার্সের তথ্য অনুসারে, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফ্রান্সের বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখা, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাঁদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও অন্যান্য ব্যয় বাড়লেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এতে সাধারণ পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
এদিকে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গত ৯ অক্টোবর (শুক্রবার) সরকারের আর্থসামাজিক নীতি ও প্রস্তাবিত ব্যয়সংকোচন কর্মসূচির বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ফরাসি সংবাদপত্র লা মঁদ-এর ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার।
মিছিলটিতে রেলকর্মী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মচারী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা যোগ দেন। সরকারি ব্যয় হ্রাস, মজুরি সমন্বয়সংক্রান্ত সম্ভাব্য পরিবর্তন, সামাজিক সুরক্ষা খাতে চাপ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে তাঁরা আপত্তি জানান। শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষা খাতে অর্থসংকোচনের আশঙ্কাও তুলে ধরেন।
ইউরোনিউজের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও ব্রাসেলসের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে একাংশের সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা, সরকারের প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
ইতালির মিলানেও ১৭ অক্টোবর (শনিবার) জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির উচ্চমূল্য, কম মজুরি এবং জনসেবার ঘাটতির প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের বিখ্যাত ডুওমো ক্যাথেড্রাল চত্বরের কাছে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করে। এতে কয়েকটি দোকান ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় অভিযান চালায়।
ইতালির সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, বোলোনিয়াতেও আরেকটি বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। তবে সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সব বিক্ষোভকারীর অংশগ্রহণকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো মানুষ এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন ও পোর্তোতে গত ১১ অক্টোবর (রবিবার) আবাসনসংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামেন। ইউরোনিউজের ওই দিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘এভাবে আর বেঁচে থাকা যায় না’—এমন অর্থবাহী একটি প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে এসব কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা কম মজুরি, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং বাড়ির ক্রমবর্ধমান দামের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এরপর ১৭ অক্টোবরও পর্তুগালের বিভিন্ন এলাকায় আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন লিসবনে হাজারো মানুষ মিছিলে অংশ নেন। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং জনসেবার মান উন্নয়ন। ইউরোনিউজের ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও দেশটির আবাসনসংকট ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষের চিত্র উঠে আসে।
চার দেশের বিক্ষোভের কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। ফ্রান্সে মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার অবনতি নিয়ে অসন্তোষ, বেলজিয়ামে ব্যয়সংকোচন ও আর্থসামাজিক সংস্কারের বিরোধিতা, ইতালিতে উচ্চমূল্য ও কম মজুরি এবং পর্তুগালে আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষের ক্ষোভের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
তবে দেশগুলোর পরিস্থিতিতে একটি সাধারণ বিষয় স্পষ্ট—আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, আবাসনের বাড়তি খরচ এবং জনসেবায় অর্থায়ন নিয়ে অসন্তোষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাড়িভাড়া, জ্বালানি ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক মানুষ। তাঁদের একাংশের অভিযোগ, আয় বৃদ্ধি না পাওয়ায় দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসনসুবিধা বাড়ানো সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার দেশের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি পড়ে, তখন তা কেবল আর্থিক সংকটেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে।
The post জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপের চার দেশ appeared first on ভোরের চেতনা.
