ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা দিতে টাকা দাবি ও দরকষাকষির মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দেওয়া মো. রাকিবের বিরুদ্ধে। খতিয়ানের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সেবাপ্রত্যাশীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি কোনো রসিদ। এ ছাড়া সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে না আসার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা।
অভিযোগকারী সবুজ মুসলমান জানান, গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দাগ নম্বর দিয়ে এসএ খতিয়ান খুঁজতে যান তিনি। এ সময় অফিসের সহায়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মো. রাকিব তাকে জানান, খতিয়ান খুঁজে পেতে কয়েক দিন সময় লাগবে এবং কাজটি ঝামেলার। একপর্যায়ে কিছু খরচ দিলে খতিয়ান খুঁজে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পরে সার্চিং ফি হিসেবে রাকিবকে ৩০০ টাকা দেন সবুজ। এরপর ১৮টি খতিয়ানের তথ্য পাওয়া যায়।
এসব খতিয়ানের কপি পাওয়া যাবে কি না জানতে চাইলে দেওয়া যাবে বলে জানান রাকিব এবং রোববার অফিসে আসতে বলেন।
সবুজ মুসলমানের অভিযোগ করেন, রোববার অফিসে গেলে ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান তাকে বলেন, এসব খতিয়ান দেওয়ার নিয়ম তাদের নেই। তবে প্রতিটি খতিয়ানের জন্য ২০০ টাকা করে মোট ১৮০০ টাকা দিলে তা দেওয়া সম্ভব। এ নিয়ে দরকষাকষির একপর্যায়ে তিনি ১৫০০ টাকা দাবি করেন। পরে ১০০০ টাকা দিলে অফিস সহায়ক রাকিব খতিয়ানের নথির ছবি তুলে কম্পিউটারের দোকানে পাঠান। সেখান থেকে প্রিন্ট করে আনতে বলা হয়।
পরে কম্পিউটারের দোকানে আরও ১০০ টাকা দিয়ে ১৮টির মধ্যে ১৬টি খতিয়ান প্রিন্ট করাতে পারেন তিনি। বাকি দুটি খতিয়ান না পেয়ে আবার অফিসে গেলে তাকে পরদিন সোমবার আসতে বলা হয়। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাননি তিনি। এ ঘটনায় নেওয়া কোনো টাকার রসিদও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সবুজ।
তিনি আরও বলেন, শুধু তিনি নন, তার মতো অনেক সেবাপ্রত্যাশী টাকা দিয়ে সেবা নেন। দীর্ঘদিন ধরে খাজনা, খতিয়ান ও নামজারির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে ওই অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টার পর সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমানকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে একটি ভিডিওতে বজলুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নাই। এটা রেকর্ড রুম থেকে সহিমোহর আনতে হবে। আমরা আপনাদের সহযোগিতার জন্য মাঝে মধ্যে দিয়ে থাকি।’ ওই ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘ভাই, আপনার ওই ১৮০০ টাকাই দিতে হবে।’ পরে তিনি ১৫০০ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে মো. রাকিব বলেন, ‘আমি স্থায়ী কোনো পদে চাকরি করি না। অফিসের কাজে ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান স্যার আমাকে তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করান। কাজের ক্ষেত্রে অনেকে খুশি হয়ে আমাকে যা দেন, তাই রাখি। কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিই না।’
অভিযোগকারী সবুজের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে রাকিব বলেন, ‘আমি ৫০০ টাকা চেয়েছি। তিনি খুশি হয়ে ৩০০ টাকা দিয়েছেন। এটা কোনো সরকারি ফি নয়।’ ওই দিন বজলুর রহমান অফিসে আসেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, জমির খাজনা পরিশোধ, নামজারি ও অন্যান্য সেবা নিতে সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি, হয়রানি এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে না আসার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
শাহাজল খান নামে এক সেবাপ্রত্যাশী বলেন, জমির দাখিলার জন্য আবেদন করে পাঁচ দিন অফিসে গিয়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে পাননি তিনি। পরে ওই কাজ আর করতে পারেননি।
মোস্তাফিজুর রহমান নামে আরেক সেবাপ্রত্যাশী বলেন, বিআরএস খতিয়ান এসেছে কি না, তা জানতে কয়েকবার ভূমি অফিসে গিয়েও কোনো সমাধান পাননি। পরে জেলা রেকর্ড অফিসে গিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে তাকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনোরঞ্জন বর্মন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রিফাত হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা দুজনই মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
