Published on
:
2 min read
সোমনাথ মাইতি, পটাশপুর
আকাশে–বাতাসে ম ম করছে পুজোর গন্ধ। নয়ানজুলির দু’পাড়ের কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। শরতের আকাশে ভাসছে সাদা মেঘের ভেলা। পুজোর এমন খুশিয়াল আবহেও ওদের মুখে যেন জমে ছিল আষাঢ়ের গুমোট মেঘ। বিষয়টি চোখ এড়ায়নি স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুমনকল্যাণ প্রধানের। পুজোর ছুটি শুরুর আগের দিন, গত বুধবার অফিস–রুমে যাওয়ার সময়ে তাঁর কানে আসে পড়ুয়াদের কথোপকথন,
—কী রে, কাল থেকে তো পুজোর ছুটি। ঠাকুর দেখতে যাবি না?
—আমাদের গাঁয়ে তো পুজোই হয় না রে! তুই?
—শুনেছি, এগরায় নাকি খুব ভালো থিমের পুজো হয়।
—সে জানি। বাবাকেও বলেছি। কিন্তু নিয়ে যাবে কি না জানি না।
—হুম, আমিও তো বলে রেখেছি। দেখি...
দরজায় টোকা দিয়ে ক্লাস ফোরের ঘরে ঢুকলেন সুমনকল্যাণ। ২০২২–এ তিনি যোগ দিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের ইটাচনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পটাশপুর সাহাপুরের বাসিন্দা সুমনকল্যাণ নিজেও বিলক্ষণ জানেন, ইটাচনার বেশিরভাগ লোকজনেরই আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। চাষ–আবাদ করে কোনও রকমে দিন গুজরান করেন। সে গ্রামে পুজোও হয় না। টোটো ভাড়া করে পড়শি গ্রাম বা এগরা শহরে গিয়ে ঠাকুর দেখা অনেকের কাছেই বিলাসিতা। ফলে, পড়ুয়াদের মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক।
হেডস্যরকে আচমকা ক্লাসে ঢুকতে দেখে তড়িঘড়ি সকলে উঠে দাঁড়িয়েছিল। ভেবেছিল, ক্লাসে গল্প করার জন্য প্রধানশিক্ষক বুঝি বকাঝকা করবেন! কিন্তু, সবাইকে চমকে দিয়ে কথাটা পাড়লেন সুমনকল্যাণ, ‘সপ্তমীর সকালে এগরায় ঠাকুর দেখতে যাবি? টোটো ভাড়া করে আমরা নিয়ে যাব। কিন্তু, শর্ত একটাই— কোনও রকম দুষ্টুমি করা চলবে না। রাজি?’ প্রথমে তো কথাটা বিশ্বাসই হচ্ছিল না পড়ুয়াদের। তারপরে সমস্বরে গর্জে ওঠে গোটা ক্লাস, ‘রাজি... রাজি।’
শনিবার সকাল সাড়ে সাতটায় নতুন পোশাক পরে স্কুলে হাজির হয়ে যায় পড়ুয়ার দল। সেখান থেকে তিনটে টোটোয় মোট ৩০ জন পড়ুয়া বেরিয়ে পড়ে। গন্তব্য— এগরা শহর। সঙ্গে ছিলেন প্রধানশিক্ষক, সহ–শিক্ষক চয়ন সাহু ও স্কুল পরিচালন সমিতির সদস্য শিবানী কামিল্যা। শিক্ষকদের হাত ধরে দিনভর হইহই করে ঠাকুর দেখে, টিফিন খেয়ে দুপুরে বাড়ি ফেরে পড়ুয়ারা।
সুমনকল্যাণ বলছেন, ‘পুজোর আনন্দ থেকে ছোটরা বঞ্চিত থাকলে কি ভালো লাগে, বলুন তো! তাই আমরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াদের নিয়ে এই আয়োজন করেছিলাম। ওরা উচ্ছ্বসিত, আমরাও খুশি।’ শিক্ষকদের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অভিভাবকরাও। সোনালি দাস যেমন বলছেন, ‘আমাদের যা আর্থিক অবস্থা তাতে কাজ আর সংসার সামলে দূরে কোথাও পুজো দেখতে যাওয়াটা সম্ভব হয় না। ছেলেমেয়েরাও মনখারাপ করে বসে থাকে। তবে ওরা এ বার খুব আনন্দ করেছে।’
তৃতীয় শ্রেণির অঙ্কিতা দাস, সমরেশ দাস, চতুর্থ শ্রেণির সুনীতা পট্টনায়ক, প্রীতি বেরা, সায়ন দাসদের কথায়, ‘আমরা এগরা, পটাশপুর মিলিয়ে দশটি মণ্ডপে ঠাকুর দেখেছি। একটুও দুষ্টুমি করিনি। স্যররা বলেছেন — আসছে বছর, আবার হবে!’
