হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে গেলে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় সরকারি খাত কতটা জনবলসংকটে ভুগছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যই বলছে, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে। এর অর্থ অনুমোদিত পদের এক–চতুর্থাংশ শূন্য রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রেখে নাগরিকদের প্রত্যাশিত সরকারি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন, আবার অপ্রয়োজনে লোক নিয়োগ করে সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়ানোও যুক্তিসংগত নয়।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, জনপ্রশাসন–সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানানো হয়েছে, বর্তমান সরকার শূন্য পদ পূরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারের যাত্রার প্রথম ১৮০ দিনে ২ হাজার ৮৭৯টি পদ পূরণের লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ৬১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হয়। তবে শুধু কতগুলো পদ পূরণ করা হলো, সেটিই বড় কথা নয়; এসব নিয়োগ প্রয়োজনীয় ছিল কি না, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলের একজন সদস্য অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আবার কোনো কোনো কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক কারণে বদলি করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কারণ, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হলে মেধাভিত্তিক প্রশাসনের ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের চর্চা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা। সরকারি চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজনৈতিক বিবেচনা যদি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনোভাবে ফিরে আসে, তাহলে সেটা বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিপুলসংখ্যক শূন্য পদ দেখেই নির্বিচার নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কোন দপ্তরে কত জনবল প্রয়োজন, কোথায় অতিরিক্ত জনবল রয়েছে, কোন পদ সময়ের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে—এসবের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা দরকার। ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার এবং কাজের ধরন বদলের কারণে সব পুরোনো পদ একইভাবে প্রয়োজনীয় না–ও হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক সেবা যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে, সেখানে জনবলের ঘাটতি থাকলে তা অগ্রাধিকার দিয়ে পূরণ করতে হবে।
দলীয়করণ, পক্ষপাতমূলক বদলি-পদায়ন ও মেধার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। মাথাভারী প্রশাসন সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূলে জনবলসংকটে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে। ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে যে ৩৫০টির বেশি দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, ইনস্টিটিউট, করপোরেশন রয়েছে, তার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে আমলাদের নিয়োগ অথবা সরকারি দলের নেতাদের পুনর্বাসন করা হয়। জনগণের অর্থে গোষ্ঠীবিশেষকে পুরস্কৃত করার এই চর্চা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।
নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতেই হবে। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের ব্যয় কমানোরও বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, সরকারি খাতে উদ্বৃত্ত ও শূন্য পদ পর্যালোচনা, অপ্রয়োজনীয় বিভাগ একীভূত করা, অপ্রয়োজনীয় নিয়োগ বন্ধ রাখা এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়াটা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে।
