কানাডা থেকে তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়া সংক্রান্ত বহুল আলোচিত গণভোটের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রদেশটির বিপুল সংখ্যক বাসিন্দা কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষেই রায় দিয়েছেন।
এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্র ও সমর্থকগোষ্ঠী।
সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি এবং বেসরকারি নেটওয়ার্ক সিটিভির তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় ঐক্যের (ফেডারেলিস্ট) পক্ষের শক্তি বড় ব্যবধানে জয়লাভ করতে যাচ্ছে। ভোট গণনার এক-তৃতীয়াংশ শেষে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ৭৬ শতাংশের বেশি ভোটার কানাডার অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে রায় দিয়েছেন।
এমন এক সময়ে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হলো যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অস্থিরতা চলছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর আগে এই ভোট আয়োজনকে ‘সবচেয়ে অনুপযুক্ত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধ চালাচ্ছেন এবং কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে এমন স্পর্শকাতর সময়ে এই গণভোট দেশের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতিক্রিয়া
ভোটের ফল নিজেদের পক্ষে না এলেও সহজে দমে যাচ্ছে না বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট’-এর শীর্ষ নেতা জেফরি র্যাথ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, একটি স্বাধীন আলবার্টা গড়ার লক্ষ্যে তাদের আন্দোলন ও প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
তবে সাধারণ ভোটারদের মাঝে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থক ৪০ বছর বয়সী জুর ডেইন হতাশা প্রকাশ করে জানান, কানাডার অংশ হিসেবেই যদি সবকিছু চলতে থাকে, তাহলে তিনি এই প্রদেশ ছেড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
এদিকে এডমন্টনে ফেডারেলিস্টদের নির্বাচনি অনুষ্ঠানে ছিল উৎসবের আমেজ। ‘ফরেভার কানাডিয়ান’ সংগঠনের প্রধান থমাস লুকাসজুক বলেন, সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ কানাডীয়দের মাঝে এমন দৃঢ় সংকল্প ও দেশপ্রেম দেখে তিনি আনন্দিত। আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজেও স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তার মতে, প্রদেশটিকে দীর্ঘকাল ধরে বিভক্ত করে রাখা এই সংকটের একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত সমাধানের জন্যই এই গণভোটের প্রয়োজন ছিল।
বিদেশি হস্তক্ষেপ ও তেলের রাজনীতি
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুত রয়েছে আলবার্টায়। মূলত তেল শিল্প পরিচালনার সরকারি নীতি ও ক্ষোভ থেকেই এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্ম। প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ এর জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে দায়ী করে অভিযোগ করেন যে, ট্রুডোর জলবায়ু-বান্ধব নীতি আলবার্টার তেল অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
তবে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেপথ্যে বিদেশি প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আলবার্টাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমনকি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্কও সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন যে, আলবার্টার উচিত কানাডা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া। জানা গেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে বৈঠক এবং রিপাবলিকান রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন।
গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অটোয়া ও আলবার্টার মধ্যকার বরফ গলাতে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি স্মিথের সঙ্গে মিলে বিদেশে বিটুমিন (অপরিশোধিত তেল) রপ্তানির জন্য নতুন পাইপলাইন চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন।
ভোট প্রদানকারী ৪৪ বছর বয়সী হেইলি এরডেগার্ড মনে করেন, আলবার্টার তেল সম্পদের আয় কানাডার অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়েছিল, তা অমূলক। কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য বজায় রাখার ওপরই এখন সবার জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
তথ্যসূত্র: এএফপি
