রিজিকের বেশ কিছু প্রকার রয়েছে, আসুন এবার আমরা রিজিকের প্রকারগুলো সম্পর্কে জানি–
প্রথমভাগ–দৈহিক রিজিক ও আত্মিক রিজিক: আমাদের শরীরের একটা চাহিদা আছে, আবার আমাদের মনের বা আত্মারও একটা চাহিদা আছে। শরীরের চাহিদা মেটে খাবার, পানি, ঘুম, বাসস্থান দিয়ে–সুতরাং এগুলো দৈহিক রিজিক। আর অন্তরে প্রশান্তি, হৃদয়ের প্রশস্ততা, ঈমানের স্বাদ ও সুকুন–এগুলো আত্মিক রিজিক।
অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষের দৈহিক রিজিক পরিপূর্ণ–ভালো খাবার, ভালো বাড়ি, সবই আছে। অথচ তার মনে শান্তি নেই, রাতে ঘুম হয় না, বুকের মধ্যে একটা হাহাকার লেগেই থাকে। এর মানে হলো, তার দৈহিক রিজিক থাকলেও আত্মিক রিজিকের ঘাটতি আছে।
আবার উল্টোটাও হতে পারে–কারও হাতে টাকা কম, বাড়ি নেই, গাড়ি নেই কিন্তু মনের মধ্যে এমন প্রশান্তি যেন সে রাজার মতো ঘুমায়। এই দুই ধরনের রিজিকই আল্লাহর দান, আর দুটোকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয় ভাগ–দুনিয়ার রিজিক ও আখিরাতের রিজিক: কারও ইন্তেকাল হলে আমাদের সমাজের অনেককেই একটা কথা বলতে শোনা যায়, লোকটার রিজিক শেষ হয়ে গেছে, তাই তার মৃত্যু হয়েছে–কথাটা আংশিক ঠিক কিন্তু এর মাঝে রিজিকের প্রকারগত একটি শিক্ষা রয়েছে। সেটি হলো–আমরা মনে করি রিজিক শব্দটা শুধু দুনিয়ার সঙ্গেই সম্পৃক্ত। অথচ আল্লাহতায়ালা কোরআনে অসংখ্য জায়গায় আখিরাতেও রিজিক দেওয়ার কথা বলেছেন। জান্নাতিদের রিজিক প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, যখনই তাদের জান্নাতের ফল থেকে রিজিক হিসেবে খেতে দেওয়া হবে, তারা বলবে, এ তো সেই ফল যা আমাদের আগেও দেওয়া হয়েছিল। (সুরা বাকারা, ২৫)
তাহলে বোঝা গেল, রিজিক শুধু দুনিয়ার জীবনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ দুনিয়ার জীবনের জন্য রিজিক রেখেছেন এবং আখিরাতেও আমাদের জন্য রিজিক রয়েছে। তবে দুনিয়ার রিজিক সাময়িক, কিন্তু আখিরাতের রিজিক চিরস্থায়ী। যে মানুষ শুধু দুনিয়ার রিজিক নিয়েই ব্যস্ত, সে আসলে বড় রিজিকটাকেই ভুলে বসে আছে।
দুনিয়াকেন্দ্রিক রিজিকের ফাঁদ–সমস্যাটা তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ রিজিক বলতে শুধু দুনিয়ার সম্পদকেই বোঝে, আর সেটাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে এই মানসিকতার পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্ক করেছেন, যে ব্যক্তি (শুধু) তাৎক্ষণিক এই দুনিয়া কামনা করে, আমি তাকে এখানেই যা ইচ্ছা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিই, যাকে আমি চাই। এরপর তার জন্য নির্ধারণ করি জাহান্নাম, যেখানে সে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে। (সুরা বনি ইসরাইল, ১৮)। এই আয়াতটা ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো একটা বাস্তবতা তুলে ধরে। দুনিয়ার রিজিক পাওয়া মানেই সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। বরং কখনো কখনো প্রাচুর্য একটা পরীক্ষা, এমনকি একটা সতর্কবার্তাও হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা বানিয়ে নেয়, আল্লাহ তার বিষয়াদি এলোমেলো করে দেন, তার দারিদ্র্যকে তার দুই চোখের সামনে রেখে দেন, আর দুনিয়া থেকে তার জন্য যতটুকু নির্ধারিত আছে তার বেশি কিছুই সে পায় না। (ইবনে মাজাহ, ৪১০৫)। লক্ষ করুন, এই হাদিসে বলা হচ্ছে না যে দুনিয়ার জন্য কাজ করা নিষেধ। বলা হচ্ছে, দুনিয়াকে যদি জীবনের একমাত্র ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে সেই দুশ্চিন্তাই তাকে গ্রাস করে ফেলে, অথচ নির্ধারিত রিজিকের বাইরে এক পয়সাও বেশি আসে না।
তৃতীয় ভাগ–দৃশ্যমান রিজিক ও অদৃশ্য রিজিক: এই ভাগটা একটু গভীরভাবে বোঝা দরকার। ধরুন, আপনি রাতে ঘুমাচ্ছেন–এই ঘুমটা দৃশ্যমান রিজিক। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার শরীরের ক্লান্তি দূর হয়ে যে সতেজতা এসেছে, যে শক্তি আপনি পেয়েছেন–এটা অদৃশ্য রিজিক।
আরেকটা উদাহরণ দিই। আপনি একটা খাবার খাচ্ছেন–এই খাবারটা আপনি চোখে দেখতে পাচ্ছেন, এটা দৃশ্যমান রিজিক। কিন্তু এই খাবার খাওয়ার পরে আপনার যে ক্ষুধা নিবারণ হচ্ছে, শরীরে যে শক্তি আসছে–যেটা চোখে দেখা যায় না, সেটা হচ্ছে অদৃশ্য রিজিক।
এখন চিন্তা করে দেখুন, এমন অনেক মানুষ আছে যারা ঘুমায়, কিন্তু ঘুম থেকে উঠেও তাদের ক্লান্তি দূর হয় না। তার মানে সে দৃশ্যমান রিজিকটা পেয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য রিজিকটা পায়নি। আল্লাহতায়ালা জাহান্নামিদের খাবারে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের জন্য বিষাক্ত কণ্টক ব্যতীত খাদ্য নেই। যা পুষ্ট করে না এবং ক্ষুধা নিবারণ করে না। (সুরা গাশিয়াহ, ৬-৭)
জাহান্নামিদের খাবারের মাধ্যমে ক্ষুধা মিটবে না এবং তাতে থাকবে না কোনো পুষ্টিগুণ। দুনিয়ার খাবারে দুটি গুণ থাকতে হবে–একটি হলো ক্ষুধা নিবারণ, আরেকটি হলো পুষ্টিগুণ। খাবার হলো দৃশ্যমান রিজিক আর ক্ষুধা নিবারণ করা ও পুষ্টিগুণ হলো অদৃশ্য রিজিক।
চতুর্থ ভাগ–কিছু রিজিক বান্দাকে খোঁজে, কিছু বান্দা রিজিক খোঁজে: রিজিকের একটা চমৎকার ভাগ রয়েছে, যে ভাগটি আমাদের চিন্তার জগতে আঘাত হানতে পারে। আলী (রা.) তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, রিজিক দুই প্রকার: এক প্রকার রিজিক তুমি যাকে খুঁজে বেড়াও, আরেক প্রকার রিজিক যে রিজিক তোমাকে খুঁজে বেড়ায়; যে রিজিক তোমাকে খুঁজে বেড়ায়, তুমি যদি তার কাছে না-ও যাও, সে তোমার কাছে এসে পৌঁছাবে। (কানজুল উম্মাল, ১৬/১৭৭)
আল্লামা সাঈদ আহমাদ পালনপুরী (রহ.) বলেছেন, বান্দা যখন ইবাদত ছেড়ে রিজিকের পেছনে পেছনে ঘুরে বা রিজিককে খোঁজে, তার এ খোঁজা দেখে রিজিক হাসে আর ভাবে–আমার তাকে খোঁজার দায়িত্ব ছিল, অথচ সে আমাকে খুঁজে ফিরছে।
সুতরাং রিজিককে খোঁজা বাদ দিয়ে যিনি রিজিকদাতা, যিনি রিজিকের মালিক তাকে খোঁজা শুরু করতে হবে, তার হুকুম-আহকাম মানতে হবে এবং তার ইবাদতে মনোযোগী হতে হবে।
আল্লাহ উপার্জন করো বলেননি, বলেছেন তালাশ করো–রিজিক উপার্জনযোগ্য কোনো বিষয় নয়; রিজিক হলো গ্রহণযোগ্য বা গ্রহণশীল বিষয়। পবিত্র কোরআনে ১২৩ বার রিজিক শব্দটা এসেছে। অথচ এর কোথাও আল্লাহতায়ালা বলেননি, তোমরা রিজিক উপার্জন করো। বরং তিনি বলেছেন রিজিক তালাশ করতে, অন্বেষণ করতে। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করো তারা তো তোমাদের রিজিকের মালিক নয়। কাজেই তোমরা আল্লাহর কাছেই রিজিক চাও এবং তারই ইবাদত করো। আর তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তোমরা তারই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। (সুরা আনকাবুত, ১৭)
আল্লাহতায়ালা আরও এরশাদ করেছেন, নামাজ শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। (সুরা জুমা, ১০)
আরেক আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তিনিই পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন, সুতরাং তোমরা তার আনাচে-কানাচে বিচরণ করো এবং তার দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো। (সুরা মুলক, ১৫)
লক্ষ করুন, আল্লাহ কত সুন্দরভাবে বলেছেন–রিজিক প্রার্থনা করো, তালাশ করো, বিচরণ করো এবং আহার করো মানে গ্রহণ করো। আল্লাহ কোথাও বলেননি রিজিক অর্জন করো বা উপার্জন করো। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটাই বুঝিয়ে দেয়, রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ; আমরা শুধু তার দেওয়া পথে হেঁটে, চেষ্টা-পরিশ্রম করে এবং তার ইবাদত করে তা খুঁজে নেব বা গ্রহণ করব।
আসুন একটা দুনিয়াবি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করি–বাংলাদেশে বা পৃথিবীতে অনেক কোম্পানি আছে, প্রতিটি কোম্পানিতে দুটি শ্রেণির মানুষ থাকে–একটা হচ্ছে মালিক শ্রেণি, আরেকটা হচ্ছে কর্মী শ্রেণি। এখন মালিক শ্রেণির কাজ কী? আর কর্মী শ্রেণির কাজ কী? দুই শ্রেণির কাজ আলাদা আলাদা। মালিকের কাজ হচ্ছে টাকা-পয়সা জোগাড় করে বেতন দেওয়া আর কর্মীর কাজ হচ্ছে বা দায়িত্ব হচ্ছে সে কর্ম করে বেতন নেওয়া।
এখন আপনি যদি বলেন, না ভাই কর্মীর দায়িত্ব হচ্ছে বেতন দেওয়া, মালিকের কাজ হচ্ছে বেতন নেওয়া। এটা আমি আপনি মেনে নেবেন? নেবেন না কারণ কী? কারণ হলো এটা উল্টা। ঠিক বিষয় হচ্ছে, মালিক বেতন দেবেন আর কর্মী বেতন নেবেন।
আসুন এবার বিষয়টা রিজিকের সঙ্গে মিলাই–আমরা কি স্রষ্টা নাকি সৃষ্টি? মালিক নাকি কর্মী-বান্দা? আল্লাহ মালিক আমরা কর্মী, তিনি স্রষ্টা আমরা সৃষ্টি, তিনি মালিক আমরা তার গোলাম। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা দিয়ে তিনি আমাদের রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, বলেছেন, জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহর। (সুরা হুদ, ৬)
মালিকের দায়িত্ব বেতন দেওয়া কর্মচারীর দায়িত্ব বেতন নেওয়া। আল্লাহর আমাদের মালিক–তার দায়িত্ব রিজিক দেওয়া, তিনি আমাদের রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমরা তার বান্দা, তার গোলাম, তার দাস–আমাদের দায়িত্ব হলো ইবাদত করে, দায়িত্ব পালন করে তার দেওয়ার রিজিক গ্রহণ করা। প্যাচটা এখানে এসে লেগেছে, আমরা রিজিক গ্রহণ করি না; আমরা রিজিক উপার্জন করতে চাই, রিজিক অর্জন করতে চাই–শ্রমিক হয়ে মালিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলে পরিণতি ভালো হবে নাকি খারাপ হবে? এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক
