জান্নাতুল আলা
মায়ের কোল থেকে শেষবার কবে নেমে গিয়েছি মনে পড়ে না। শেষবার কবে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়েছি— সেটাও মনে পড়ে না। খুব ছোটবেলার মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করি, কিন্তু স্মৃতিটা যেন ঝাপসা হয়ে গেছে। কৈশোরে পৌঁছানোর পর মায়ের বয়স একটু বেড়েছিল, তখনকার মুখটা বেশ স্পষ্ট মনে আছে। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের চোখের সামনেই সময়ের সাথে হেঁটে হেঁটে মা বয়স্ক হয়ে গেলেন।
মায়ের এই অসহায় বার্ধক্যের চেহারা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। বয়স্ক আঙুলগুলো যেন এখনও সন্তানের ভালোবাসার স্পর্শ খোঁজে। সন্তানের জন্য কত রাত জাগা, সংসারের জন্য কত পরিশ্রম করা একজন জীবনযোদ্ধার এমন অসহায় রূপ দেখতে সত্যিই খুব কষ্ট লাগে। এখন তিনি নিজের অনেক কাজই আর ঠিকমতো করতে পারেন না।
ভাবি— ছোটবেলায় মা যেভাবে আমাদের সব কাজ করে দিতেন, আমরা কি পারি না বড় হয়ে এসে মায়ের কাজগুলো সেভাবে করে দিতে? মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করি— মায়ের ভালোবাসা যদি আকাশসমান হয়, সন্তানের ভালোবাসাটা সেই আকাশের একটি তারাও কেন হয় না?
আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন আমাদের অংশ, তেমনি আমরাও আমাদের মায়ের অংশ। কিন্তু মা তো আমাদের অংশ নন— হয়তো এই কারণেই আমরা তাকে নিয়ে এতটা ভাবি না। গাছ যেমন বড় হতে হতে মাটি থেকে দূরে সরে যায়, শাখা-প্রশাখা মেলে বিশাল আকাশের নিচে— আমরাও বড় হতে হতে মায়ের কাছ থেকে দূরে চলে যাই।
যখন আমার ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকাই, তখন মাকে ভীষণভাবে অনুভব করি। আমার মেয়ের সারাক্ষণ আমাকে প্রয়োজন হয়। আমি ছাড়া তার আপন কেউ নেই— তার পৃথিবী এখন আমাকে ঘিরেই। অথচ একসময় আমার পৃথিবীও তো মাকে ঘিরেই ছিল। কিন্তু বড় হতে হতে আমাদের পৃথিবীতে অনেক মানুষ আসে, অনেক দায়িত্ব আসে— আর মায়ের জন্য সময়টা একটু একটু করে কমে যায়।
ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে প্রতিদিন নিয়ম করে মায়ের খোঁজ নেওয়াটাও কখনো কখনো হয়ে ওঠে না। মা কী খেলেন, তার মন ভালো আছে কি না— এই ছোট প্রশ্নগুলোও মাঝেমধ্যে করা হয় না। তবুও হঠাৎ যখন বৃষ্টি নামে, খুব ইচ্ছে করে ঝাপসা শহর পেছনে ফেলে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। তার সামনে বসে এক এক করে খুলে ফেলি আমার জড়তা, আড়ষ্টতা, বড় হয়ে যাওয়ার সব ভান। সব এনে জমা করি মায়ের পায়ের কাছে।
মায়ের সামনে বসে আবার ছোটবেলায় ফিরে যেতে খুব ইচ্ছে করে। ছোটবেলা থেকে একটি প্রশ্ন শুনে এসেছি— “বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?”
এখন কেউ যদি সেই প্রশ্ন করে, আমার উত্তর বদলে যাবে—
বড় হয়ে আমি আবার ছোট হতে চাই।
মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে চাই।
কিন্তু গল্প কি আর শোনা হবে?
পৃথিবীর তাপমাত্রা যেমন দিন দিন বেড়ে চলেছে, তেমনি মনের ভেতরেও যেন এক অদৃশ্য উত্তাপ জমে থাকে। সেই গরমে মায়ের জন্য ভালোবাসার ফুলটাও কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই মাঝে মাঝে ভালোবাসার সেই ফুলগুলোকে ঠান্ডা অনুভূতির জলে ভিজিয়ে নিতে হয়— যত্নে, সময় দিয়ে, মন দিয়ে। তবেই না সতেজ থাকবে মায়ের জন্য জমিয়ে রাখা ভালোবাসা।
খুব ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে মাকে জড়িয়ে ধরে বলি—
“মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”
হয়তো বড় হয়ে গেছি বলেই কথাটা সামনাসামনি বলা হয়ে ওঠে না। তবুও মনে মনে প্রার্থনা করি—
আমাদের মা যেন আমাদের পৃথিবীর আলো হয়ে থাকেন আরও অনেক বছর। তিনি যেন ভালো থাকেন। আমরা যেন তাকে ভালো রাখতে পারি। আমাদের কোনো কথা বা কাজে যেন তার মনে কষ্ট না লাগে।
কারণ—
মা আছেন বলেই পৃথিবী এত সুন্দর।
লেখক: জান্নাতুল আলা
কলেজ শিক্ষিকা এবং লেখক
