সাকিবুল হাছান
ছোটবেলায় কি কখনো ভেবেছিলেন যে একদিন ইসলামী সংগীত শিল্পী হবেন?
আসলে ছোটবেলায় এমন স্বপ্ন আমি দেখিনি তবে ইসলামী সংগীতের প্রতি একটা অদ্ভুত টান সবসময়ই ছিল। গ্রামের মসজিদ, মাদরাসায় যখন কারো মুখে নাশিদ শুনতাম, মনে হতো—এই শব্দ, এই সুরের ভেতরে এক ধরনের শান্তি আছে। ধীরে ধীরে সেই ভালোবাসাটাই আমার জীবনের অংশ হয়ে যায়। আল্লাহর রহমতে আজ মানুষ আমাকে একজন ইসলামিক নাশিদ শিল্পী হিসেবে চিনে — এটা আমার কাছে শুধু একটি অর্জন নয়, বরং একটি আমানত, যেটাকে আমি দাওয়াতের মাধ্যম হিসেবেই দেখি।
ইসলামিক সংগীতের প্রতি আগ্রহটা কীভাবে জন্ম নিল?
আমার ইসলামিক সংগীতের প্রতি আগ্রহ শুরু হয় খুব ছোটবেলায়, যখন মাদরাসার অনুষ্ঠানে প্রথমবার এক ভাইকে “নাশিদ” গাইতে দেখি। তাঁর কণ্ঠে কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল না, তবু তাতে এমন একটা রুহানিয়াত ছিল যে মনে গভীর দাগ কেটে যায়। তখন থেকেই ভাবতাম—আমিও যদি একদিন এমনভাবে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর প্রশংসা করতে পারতাম! সেই ভাবনাই ধীরে ধীরে অনুপ্রেরণায় রূপ নেয়, আর নাশিদ আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।
আপনার পরিবারের কেউ কি সংগীত চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
আমার পরিবারের কেউ সরাসরি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে ধর্মীয় পরিবেশ ও কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল সবার। ছোটবেলা থেকেই বাসায় কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া, ও ইসলামিক মাহফিলের আবহে বড় হয়েছি। সেই পরিবেশটাই হয়তো আমাকে ইসলামিক শিল্পচর্চার দিকে টেনে নিয়েছে।
প্রথম যে নাশিদটি গেয়েছিলেন — সেটি কী ছিল এবং কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?
আমার প্রথম নাশিদ ছিল “প্রভু তুমি মহিয়ান”। এটা আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় কাজ। খুব সাধারণভাবে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রেকর্ড করা হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশের পর মানুষ যে ভালোবাসা আর উৎসাহ দিয়েছে, সেটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। অনেকেই বলেছিলেন—নাশিদটা শুনে তাদের মন শান্তি পেয়েছে, চোখে পানি এসেছে। সেই মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, এই পথটা শুধু সংগীত নয়, এটা আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করার এক সুন্দর মাধ্যম।
ইসলামিক নাশিদ জগতে আপনাকে “নাশিদ কিং” বলা হয় — এই স্বীকৃতিটা আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
আলহামদুলিল্লাহ, “নাশিদ কিং” নামে মানুষ যখন আমাকে ডাকে, তখন আমি একে গৌরব নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে দেখি। এই নামটা আমার একার নয় — এটা তাদের দোয়া ও ভালোবাসার ফল, যারা আমার নাশিদগুলো শুনে অনুপ্রাণিত হন। আমি বিশ্বাস করি, শিল্পী শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার জন্যও দায়বদ্ধ। তাই এই স্বীকৃতি আমার কাছে একটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া— যেন আমি সবসময় খাঁটি নিয়তে, ইসলামী ভাবনা ও দাওয়াতের উদ্দেশ্যে কাজ করে যেতে পারি।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইসলামিক সংগীতকে আকর্ষণীয় করে তুলতে আপনি কীভাবে কাজ করছেন?
আমি নাশিদে আধুনিক ভিজ্যুয়াল আর সাউন্ডের ছোঁয়া দিই, তবে ইসলামী মান বজায় রেখে। তরুণরা যেন শুনে অনুপ্রাণিত হয়, আবার ইসলামিক ভাবেও জাগ্রত থাকে — সেটাই আমার মূল লক্ষ্য।
গায়ক থেকে ভিডিও ডিরেক্টর হওয়ার যাত্রাটা কেমন ছিল?
শুরুটা একেবারেই অভিজ্ঞতা ছাড়া ছিল। তবে নিজের কাজগুলো আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছা থেকেই ভিডিও পরিচালনায় নামি। শিখতে শিখতেই ভালোবাসা জন্মে যায়, আর এখন সেটা নেশায় পরিণত হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
আপনার পরিচালিত কোন প্রজেক্টটি আপনার কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল এবং কেন?
আমার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও আবেগময় প্রজেক্ট ছিল “আমার নবীজির নাম”। এই নাশিদটির আমার প্রাণপ্রিয় উস্তাদ কাজী মাশকুর এলাহি ভাইয়ার — যিনি আমার অনুপ্রেরণা, আমার পথপ্রদর্শক। তাঁর কারণেই আজ মানুষ “আতাউর রহমান হামিদি” নামটা চেনে। এই কাজটাতে ছিল দায়িত্ব, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার মিশ্রণ, তাই এটি আমার হৃদয়ের এক বিশেষ জায়গায় আছে।
“বছরের সেরা নাশিদ শিল্পী” এবং “সেরা ভিডিও ডিরেক্টর” — দুটি পুরস্কারই পেয়েছেন। এই স্বীকৃতি আপনার ক্যারিয়ারে কতটা প্রভাব ফেলেছে?
আলহামদুলিল্লাহ, এই স্বীকৃতিগুলো আমার জন্য বড় প্রেরণা। এতে আমি বুঝেছি, মানুষ শুধু শুনছে না—বোধও করছে। তাই এখন প্রতিটি কাজে আরও দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করি।
ভবিষ্যতে ইসলামিক মিউজিক ও ভিডিও ইন্ডাস্ট্রিতে আপনি কী নতুন পরিবর্তন আনতে চান?
আমি চাই ইসলামিক মিউজিককে আরও আধুনিক উপস্থাপনায় আনা হোক—যেন তরুণ প্রজন্ম আকৃষ্ট হয়, কিন্তু ইসলামী আদর্শের বাইরে না যায়। ভালো মানের প্রযোজনা, পরিষ্কার বার্তা, আর সুন্দর ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে নাশিদকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে চাই ইনশাআল্লাহ।
একজন পরিচালক হিসেবে আপনি কোন বার্তা দর্শকদের মনে পৌঁছে দিতে চান?
আমি চাই আমার প্রতিটি ভিডিওর মাধ্যমে মানুষ যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করে। বিনোদনের পাশাপাশি যেন অন্তরে নৈতিকতা ও ঈমানের আলো জ্বলে ওঠে — এটাই আমার মূল বার্তা। সর্বশেষ, আমি কাজী মাশকুর এলাহী ভাইয়ার টিমে কাজ করতে ভীষণ ভালোবাসি। আমাদের টিমের সবাই অনেক সহযোগিতাপূর্ণ ও আন্তরিক। দলের মধ্যে আছেন — আব্দুল মান্নান মিয়াজী, এনাম বিন সাইদ, আনাছ আব্দুল্লাহ, এবং আমার বন্ধুসম সাইফুল্লাহ বিন মাহমুদ। আরেকজন খুব কাছের বন্ধু আছে — সাআদুজ্জামান নুর। তার সাথে আমার অনেকগুলো নাশিদ ডুয়েট রয়েছে।
