জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে (PHP) দুটি অত্যন্ত মারাত্মক ও গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ সাইবার হামলার ঝুঁকি। হ্যাকিং ও ডেটা চুরির বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি, বেসরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর ওয়েবসাইট জরুরি ভিত্তিতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে।
যদিও বুধবার (২২ অক্টোবর) পিএইচপির কারিগরি দল সংশোধনী ও হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করেছে, তবুও নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার আগেই বহু ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড ও ফ্রান্সের একাধিক সরকারি সংস্থা ও স্পর্শকাতর দপ্তর নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র, সরকারি মূল পোর্টাল, রটারডাম বন্দর, জাতীয় ফুটবল সংস্থা কেএনভিবি, দেশটির প্রধান পাঁচটি রাজনৈতিক দল এবং কয়েকটি হাসপাতালের ওয়েবসাইট বন্ধ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা সংস্থা ‘ভালতোরি’ তাদের পুরো নেটওয়ার্কের ওয়েব পরিষেবা স্থগিত করেছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাদের স্থানীয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ডেনমার্কের জাতীয় স্কুল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও এডিনবরা কাউন্সিলের ওয়েবসাইট এবং বিবিসির ‘ডক্টর হু’ ও ‘দ্য ট্রেইটরস’-এর মতো কয়েকটি নিজস্ব ওয়েবপেজে সাময়িক প্রবেশাধিকার বন্ধ রয়েছে। তবে এসব ওয়েবসাইটের সঙ্গে সরাসরি এই পিএইচপি ত্রুটির কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, যেসকল সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে পিএইচপি-র এই ত্রুটি সংশোধন করতে পারছে না, তাদের উচিত সার্ভার ও ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা। সংস্থাটির মতে, এ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা সরাসরি দূর থেকে সার্ভারের ফাইল সিস্টেম বা স্পর্শকাতর ডেটাবেজে পূর্ণ প্রবেশাধিকার পেয়ে যেতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পিএইচপির এই লুকানো মারাত্মক ত্রুটিগুলো শনাক্ত করেন। গবেষকরা জানান, এই ত্রুটিগুলো প্রায় এক দশক ধরে উন্মুক্ত থাকলেও তা এতদিন ধরা পড়েনি। উইজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই ত্রুটির মাধ্যমে সফল হামলার কৌশল তৈরি করা সম্ভব। যার ফলে গোটা ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট ও ব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এই ঘটনাকে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে মারাত্মক সাইবার নিরাপত্তা সংকট বলে অভিহিত করেছে।
ওয়েব প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ডব্লিউথ্রিটেকস-এর হিসাবমতে, বিশ্বজুড়ে যেসব ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা যায়, তার প্রায় ৭৫ শতাংশই পিএইচপিতে তৈরি। বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী প্লাটফর্ম ওয়ার্ডপ্রেস ছাড়াও দ্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টার মতো বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলো পিএইচপির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। ফলে বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি দপ্তর, প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম, অনলাইন বিপণন কেন্দ্র থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে একযোগে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের বিশেষজ্ঞ ডন স্মিথ সতর্ক করে জানান, হ্যাকাররা এখন ঢালাওভাবে ইন্টারনেট জুড়ে দুর্বল পিএইচপি সংস্করণচালিত সার্ভার খুঁজে বের করে হামলা চালাচ্ছে। ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেন কেইনেখট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক পর্যায়ের সাইবার হামলা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এজন্য তাঁরা ফায়ারওয়ালের সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করছেন এবং দ্রুত হালনাগাদ ইনস্টল করার তাগিদ দিচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইইউ) জানিয়েছে, ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিএইচপি ৫ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় প্রতিটি সংস্করণেই এই ঝুঁকি থাকতে পারে। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পিএইচপি ৮.১ বা তার আগের সংস্করণ ব্যবহারকারী সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে পিএইচপির সর্বশেষ নিরাপদ সংস্করণে উন্নীত হতে বলেছে। একই সঙ্গে কোনো সিস্টেমে ইতোমধ্যেই হ্যাকারদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না, তা গভীর পর্যবেক্ষণ করারও পরম পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জেএইচআর
