প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও নাগরিক সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভার বাসিন্দাদের মধ্যে। ভাঙাচোরা সড়ক, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুপেয় পানির সংকট, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়কবাতির অভাবসহ নানা সমস্যায় ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন তাঁরা। আসন্ন পৌর নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঘাইছড়ি পৌরসভার ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ১৫ হাজার ৬৪৪ জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা ও নাগরিক চাহিদা বাড়লেও সে অনুযায়ী সেবার মান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। মেয়র পরিবর্তন হলেও নাগরিক দুর্ভোগের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন তাঁরা দেখতে পাননি। বর্তমানে পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়র না থাকায় আসন্ন নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
পৌরসভার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। এতে যানবাহন চলাচল ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাঁদের মতে, নিয়মিত সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কিছু এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয় বলে তাঁদের অভিযোগ। তাই সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের সঙ্গে সমন্বিত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পৌর এলাকায় নির্ভরযোগ্য ও টেকসই সুপেয় পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নিরাপদ পানির জন্য অনেক পরিবারকে নিজস্ব বা বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিকল্পিত পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে পৌর কর্তৃপক্ষ।
পৌর এলাকার বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণব্যবস্থা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো আবর্জনা অপসারণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যত্রতত্র বর্জ্য জমে থাকলে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং মশা-মাছির উপদ্রব বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
এ ছাড়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সড়কবাতির অভাব এবং কোথাও কোথাও বাতি অকার্যকর থাকার অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলো না থাকায় পথচারী ও যানবাহন চালকদের চলাচলে অসুবিধা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবহুল এলাকায় সড়কবাতি স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ চান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৌর নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, ড্রেন নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে নির্বাচনের পর এসব প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হয়, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পৌরসভা হওয়ার পর আশা করেছিলাম গ্রামের চেয়ে একটু উন্নত নাগরিক সুবিধা পাব। কিন্তু প্রতিবছরই ট্যাক্স দিই, বিনিময়ে কোনো সেবাই পাই না। মেয়ররা আসেন-যান, প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু আমাদের দুর্ভোগ যেমন ছিল, তেমনই আছে।”
দীর্ঘ ২২ বছরের পথচলায় বাঘাইছড়ি পৌরসভার নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এখন স্থানীয়দের অন্যতম দাবি। আসন্ন নির্বাচনে যিনি মেয়র নির্বাচিত হবেন, তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চান তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন মেয়র দায়িত্ব গ্রহণের পর এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়ক সংস্কার, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং সড়কবাতি স্থাপনে উদ্যোগী হবেন। পাশাপাশি উন্নয়ন বাজেটের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং নাগরিকদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন।
বাসিন্দাদের মতে, একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য পৌরসভা গড়ে তুলতে শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সমস্যার প্রতি দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে আসন্ন নির্বাচনের পর নতুন নেতৃত্ব কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন তাঁরা।
এই বাংলা/এমএস
