পুজোর ক’দিন সকাল থেকে রাত ঠাকুর দেখা, অনিয়মিত ঘুম আর রেস্তরাঁর খাবার থেকে বাড়ির বিজয়ার ভোজ। লুচি, বিরিয়ানি, মিষ্টিমুখ, সব মিলিয়ে রসনাতৃপ্তিতে খামতি থাকে না। কিন্তু উৎসবের রেশ কাটতেই ওজন মাপার যন্ত্রে চোখ পড়লে অনেকেরই মন খারাপ।
কয়েক দিনের ব্যবধানে ওজন বেড়েছে এক-দু’কেজি, কারও ক্ষেত্রে তারও বেশি। অগত্যা কেউ ভাত-রুটি খাওয়া কমিয়ে দেন, কেউ আবার বাড়তি ওজন ঝরাতে শুরু করেন কঠোর শরীরচর্চা।
কিন্তু ওজন মাপার যন্ত্রে যে বাড়তি ওজন দেখা যাচ্ছে, তার পুরোটাই কি শরীরে জমা মেদ? নাকি এর পিছনে রয়েছে শরীরের জল ধরে রাখার মতো অন্য কারণও?
ওজন বাড়ার নেপথ্যে কী?
শরীরের ওজন শুধু চর্বির হিসাব নয়। এর মধ্যে রয়েছে জল, পেশি, হাড় এবং পরিপাকতন্ত্রে থাকা খাবারের ওজনও। ফলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ওজন বেড়ে গেলে তার পুরোটাই মেদ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পুজোর সময়ে খাবারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, বেশি নুন খাওয়া, কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া এবং দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন ওজনের সাময়িক ওঠা-নামার কারণ হতে পারে।
তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বিও জমতে পারে। অর্থাৎ, পুজোর পর ওজন বৃদ্ধির পিছনে জল ধরে রাখা ও চর্বি জমা, দু’টি কারণই থাকতে পারে। কোনটির প্রভাব কতটা, তা শুধু যন্ত্রের সংখ্যা দেখে বোঝা সম্ভব নয়।
নুন-মিষ্টির সঙ্গে জলের যোগ
পুজোর ভোজে কচুরি, চপ, নিমকি, বিরিয়ানি বা অন্যান্য নোনতা খাবারের পরিমাণ বেড়ে যায় অনেকেরই। এই খাবারগুলিতে থাকা সোডিয়াম শরীরে জল ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। এর ফলে ওজন সাময়িক ভাবে বেড়ে যেতে পারে। কারও কারও মুখ ফোলা লাগে, পেট ভারী মনে হয় বা আংটি ও জুতো আগের তুলনায় আঁটসাঁট হয়ে যায়।
অন্য দিকে, লুচি, ভাত, মিষ্টি বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবার শরীরের শক্তির জোগান দেয়। শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজের কিছুটা গ্লাইকোজেন হিসেবে লিভার ও পেশিতে সঞ্চয় করে। এই গ্লাইকোজেনের সঙ্গে জলও জমা থাকে। ফলে কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে শরীরের ওজনেও সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

পেট ফোলা মানেই কি মেদ?
পুজোর সময়ে একসঙ্গে বেশি খাওয়া, রাত করে খাবার খাওয়া বা শাকসবজি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়ার কারণে হজমের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে। কারও গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা হয়, কারও আবার কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। পরিপাকতন্ত্রে খাবার ও মল থাকার কারণেও ওজন মাপার যন্ত্রে সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে।
তাই পুজোর পর পেটের মাপ বেড়েছে বা পোশাক আঁটসাঁট লাগছে বলেই যে শরীরে অনেকটা মেদ জমেছে, এমন নয়। আবার সবটাই জল ধরে রাখার ফল, এমন ভেবে নিশ্চিন্ত থাকাও ঠিক হবে না। ওজনের পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হচ্ছে, তার পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য লক্ষণও খেয়াল রাখা জরুরি।
ওজন কমাতে গিয়ে ভুল নয়
পুজোর পর ওজন বেড়েছে দেখে হঠাৎ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বা কঠোর ডায়েট শুরু করা ঠিক নয়। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বরং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসাই ভালো।
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। ভাত-রুটি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে খান। অতিরিক্ত নোনতা, তেল-মশলাযুক্ত খাবার এবং মিষ্টির পরিমাণ কমান। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত জল পান করুন। ওজন কমানোর জন্য নিজে থেকে মূত্রবর্ধক ওষুধ খাওয়া বা জল খাওয়া অস্বাভাবিক ভাবে কমিয়ে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
পাশাপাশি হাঁটাচলা বাড়ান এবং ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক শরীরচর্চার রুটিনে ফিরুন। পুজোর পর শরীর ক্লান্ত থাকলে প্রথম দিন থেকেই কঠোর ব্যায়াম শুরু করার প্রয়োজন নেই।

কখন সতর্ক হবেন?
পুজোর পর ওজন সামান্য বেড়ে গেলে এবং অন্য কোনও উপসর্গ না থাকলে স্বাভাবিক খাবার, ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে ফিরে ওজনের পরিবর্তন লক্ষ করা যেতে পারে। তবে ওজন দ্রুত বাড়তে থাকলে, পা-গোড়ালি বা মুখ অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে গেলে বা ফোলা কয়েক দিনেও না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এর পিছনে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ বা থাইরয়েডের সমস্যার মতো কারণও থাকতে পারে।
পুজোর পর যন্ত্রে বাড়তি সংখ্যা দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কয়েক দিনের ওজন বৃদ্ধি মানেই যে শরীরে অনেকটা মেদ জমেছে, তা নয়। আবার সবটাই সাময়িক জল ধরে রাখার ফল, এমন ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। তাই তাড়াহুড়ো করে ওজন কমানোর চেষ্টা না করে শরীরের পরিবর্তন বুঝুন, স্বাভাবিক রুটিনে ফিরুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
