কিছু মানুষ সময়ের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকেন তাঁদের কর্মে, আদর্শে ও মানুষের হৃদয়ে। তাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; হয়ে ওঠে একটি সমাজের আলোকবর্তিকা। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.) তেমনই একজন মানুষ। শিক্ষা, সমাজসংস্কার, সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও মানবসেবায় তাঁর অবদান চট্টগ্রামসহ পুরো বাংলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য তাঁর উদ্যোগ আজও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২৪ অক্টোবর তাঁর ৭৬তম ওফাত বার্ষিকী। ১৯৫০ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্বপ্ন, সংগ্রাম ও মানবকল্যাণের কর্মযজ্ঞ আজও আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি তাঁর আদর্শকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পেরেছি?
সময়ের চাহিদায় জেগে ওঠা এক মনীষী
১৮৭৫ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের তৎকালীন পটিয়া থানার বর্মা-আরালিয়া চর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। স্থানটি বর্তমানে চন্দনাইশ উপজেলার অন্তর্গত। যে সময় তিনি বেড়ে উঠেছেন, তখন উপমহাদেশের মুসলমান সমাজ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সামাজিক কুসংস্কার ও ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল।
এমন এক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান, যুক্তিবোধ ও সামাজিক সচেতনতার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর চিন্তায় শিক্ষা ছিল কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির সোপান নয়; ছিল একটি জনগোষ্ঠীকে আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভর করে তোলার পথ।
তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। সমাজের যে অংশটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, তাদের জন্য কাজ করাই ছিল তাঁর মানবিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
কলমে জাগরণ, কর্মে প্রতিবাদ
মাওলানা ইসলামাবাদীর পরিচয় শুধু একজন আলেম বা সমাজসেবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সাংবাদিক, লেখক ও চিন্তাবিদ। তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে শিক্ষা, সমাজসংস্কার, মুসলমানদের জাগরণ, জাতীয় চেতনা ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নানা প্রসঙ্গ।
সাংবাদিকতাকে তিনি নিছক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। মানুষের চিন্তা গঠন, সমাজের অসংগতি তুলে ধরা এবং জনসচেতনতা তৈরির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর লেখালেখি ও রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয় জাগরণে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁর চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি। অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের শৃঙ্খল অটুট থাকলে মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়।
আজকের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল ঘটনা তুলে ধরা নয়; সমাজের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াও সাংবাদিকতার মৌলিক কর্তব্য।
এতিমদের জন্য গড়ে তুললেন আশ্রয়ের বাগান
মাওলানা ইসলামাবাদীর মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা। ১৯৩০ সালে কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে ‘মুসলিম মিশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এতিম ও অসহায় শিশুদের কল্যাণে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা ছিল সময়ের তুলনায় অত্যন্ত দূরদর্শী।
একটি এতিম শিশুর জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু খাদ্য বা আশ্রয়ের অভাব নয়। তার সামনে থাকে নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবহেলা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা। মাওলানা ইসলামাবাদী সেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল অসহায় শিশুদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা আশ্রয় পাবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
একটি শিশুকে দান দিয়ে সাময়িকভাবে সহায়তা করা যায়। কিন্তু তাকে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার সুযোগ করে দিতে পারলে বদলে যেতে পারে তার পুরো জীবন। এই উপলব্ধিই তাঁর মানবসেবার উদ্যোগকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
আজ কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা সেই উদ্যোগের উত্তরাধিকার বহন করছে। এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষা, পরিচর্যা ও বিকাশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহু শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা ও জীবনের পথ খুঁজে পেয়েছে। তাঁদের অনেকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য তার ভবন, সম্পদ কিংবা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সাফল্য পরিমাপ করতে হয় কতজন শিশুর জীবন বদলেছে, কতজন শিক্ষার্থী আত্মনির্ভর হয়েছে এবং কতজন মানুষ সমাজের কল্যাণে অবদান রাখছে—সেই হিসাব দিয়ে।
উত্তরাধিকার মানে শুধু স্মরণ নয়, দায়িত্বও
প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতি রক্ষা করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। স্মরণসভা, আলোচনা, দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। তবে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তাঁর আদর্শকে প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা, মানসিক বিকাশে সহায়তা দেওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতা অর্জনের দিকেও নজর দিতে হবে।
এ জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত পরিচালনা, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, অনুদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দাতা, শুভানুধ্যায়ী ও সমাজের মানুষের আস্থা ধরে রাখতে স্বচ্ছতা হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তাঁরা নিজ নিজ অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা ও সামর্থ্য দিয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, ক্যারিয়ার পরামর্শ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ, শিল্পোদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও বিত্তবান মানুষেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে উঠলে প্রতিষ্ঠানটির সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
মানবিক সমাজ গড়ার প্রেরণা
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় ক্ষমতা কিংবা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, সাহস, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ব পালনের দৃঢ় সংকল্প।
তাঁর সময়ের সামাজিক সংকট আর আজকের বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু বৈষম্য, দারিদ্র্য, শিক্ষাবঞ্চনা ও অসহায় মানুষের প্রতি সমাজের দায়িত্ব—এসব প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক। আজও বহু শিশু নানা কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অনেকের জন্য নিরাপদ শৈশব ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত মানবসেবার দর্শন নতুন করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাঁকে যথার্থ সম্মান জানানোর অর্থ শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়; বরং বর্তমানের দায়িত্ব গ্রহণ করা। কোনো শিশু যেন পরিচয় বা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পিছিয়ে না পড়ে, কোনো মেধা যেন সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়—এমন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ই হতে পারে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.) যে মানবিক বাগানের চারা রোপণ করেছিলেন, তার পরিচর্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব। সেই বাগানে আরও নতুন ফুল ফুটুক, আরও অনেক শিশুর জীবন আলোকিত হোক। তাঁর লাগানো বাগানের ফুলে আজও সুবাসিত আমরা। সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে—মানবিক, শিক্ষিত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে।
মহান এই মনীষীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখব: প্রধান শিক্ষক, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা হেফজ বিভাগ, চট্টগ্রাম।
The post ৭৬ বছর পরও যে প্রতিষ্ঠানে বেঁচে আছে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর স্বপ্ন appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
