রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কবি, গীতিকার ও দ্রোহের কণ্ঠস্বর। স্বল্পায়ু জীবনে তিনি কবিতার মাধ্যমে অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদী উচ্চারণ সৃষ্টি করেছেন, তা তাকে বাংলা কবিতার জগতে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। তার কবিতায় প্রেম, বিরহ ও ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি প্রতিফলিত হয়েছে সাম্য, মানবিকতা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা।
১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তার প্রকৃত নাম শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলার মোংলা থানার সাহেবের মেঠ গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করেন তিনি। ‘উপদ্রুত উপকূল’ (১৯৭৯) ও ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ (১৯৮১) কবিতা দুটি তাকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। সত্তরের দশকেই তিনি শক্তিমান কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার কবিতায় সমাজের অসংগতি, মানুষের বঞ্চনা এবং শোষণমুক্ত জীবনের প্রত্যাশা গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
রুদ্রের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য দ্রোহ ও প্রেমের অপূর্ব সমন্বয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার উচ্চারণ ছিল তীব্র ও আপসহীন। একই সঙ্গে প্রেম, বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা ও ব্যক্তিমানুষের আবেগও তার কবিতায় পেয়েছে গভীর প্রকাশ। তার বিখ্যাত কবিতা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজের হতাশা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার বেদনার এক শক্তিশালী কাব্যিক প্রকাশ। তার কবিতায় প্রতিবাদ কেবল ক্ষোভের প্রকাশ নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মানুষের মানচিত্র’ (১৯৮৪), ‘ছোবল’ (১৯৮৬), ‘গল্প’ (১৯৮৭), ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ (১৯৮৮), ‘মৌলিক মুখোশ’ (১৯৯০) ও ‘একগ্লাস অন্ধকার’ (১৯৯২)। কবিতার পাশাপাশি তিনি গান, নাটক, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনাতেও আগ্রহী ছিলেন। তার লেখা ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ গানটি আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৯৮০ সালে তিনি ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ লাভ করেন।
১৯৯১ সালের ২১ জুন ঢাকায় মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই জনপ্রিয় কবি। জীবন সংক্ষিপ্ত হলেও তার সৃষ্টির আবেদন আজও অম্লান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সাম্যের স্বপ্ন তাকে নতুন প্রজন্মের কাছেও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। বাংলা সাহিত্যে দ্রোহ, প্রেম ও মানবিকতার কবি হিসেবে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।