Published on
:
4 min read
এই সময়: অগস্ট, ২০১৭। জুন, ২০২০। অক্টোবর, ২০২৬। ভারত-ভুটান-চিন সংযোগস্থলে ডোকলাম মালভূমি, পূর্ব লাদাখের গলওয়ান উপত্যকার পরে উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ। ফের সীমান্তে সংঘাতে জড়াল ভারত এবং চিনের ফৌজ। জুলাই থেকেই এই সংঘর্ষ বিক্ষিপ্ত ভাবে চলছে। তবে গত কয়েক দিনে পারদ চড়েছে বলে সেনা সূত্রের খবর।
উত্তেজনা এলএসি-তে
লাদাখের কারাকোরাম পাস থেকে শুরু করে অরুণাচল প্রদেশের জাশেপ লা পর্যন্ত ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-চিন সীমান্তে মোতায়েন ইন্ডো-টিবেটান বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ সিং কাপুর জানিয়েছেন, অরুণাচলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি) বরাবর একাধিক লোকেশনে এই সংঘর্ষ চলছে। তবে হালফিলে এই সংঘর্ষ শুরু হয়নি। গত কয়েক মাস ধরে অরুণাচল-সীমান্তে খুচরো অশান্তি চলছিলই। যা সম্প্রতি বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে। এত দিন পর্যন্ত এই সংঘর্ষের ব্যাপারে সরকারি ভাবে কিছু জানানো হয়নি। শত্রুজিতের কথায় এই সংঘর্ষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আইটিবিপি-র বার্ষিক সংবর্ধনা ‘হিমবীর সম্মান সমারোহ’-তে বক্তব্য রাখার সময়ে ‘শৌর্য কম্যান্ডো’দের (উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধ করায় দক্ষ, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী) প্রশংসা করতে গিয়ে বৃহস্পতিবার শত্রুজিৎ বলেন, ‘গত কয়েক দিনে একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অরুণাচলের বিভিন্ন লোকেশনে আমাদের সংঘর্ষের মুখে পড়তে হচ্ছে। সেই সংঘর্ষ এখনও চলছে।’ তাঁর এই মন্তব্যের পরেই অরুণাচল পরিস্থিতির বিষয়টি সরকারি ভাবে সামনে আসে। শত্রুজিতের সংযোজন, ‘এই সংঘর্ষে আমাদের শৌর্য কম্যান্ডোরা অত্যন্ত ভালো পারফর্ম করেছেন, একটি দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা নিয়েছেন।’
চিনের উস্কানি
এলএসি বরাবর প্যাট্রলিং বা টহলদারি নিয়ে অরুণাচলে সংঘাতের সূত্রপাত বলে জানা গিয়েছে। গত জুলাইয়ে ‘পিপলস পার্টি অফ অরুণাচল’-এর (পিপিএ) একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম ইঙ্গিত দিয়েছিল, তাকসিংয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারতের প্যাট্রলিং পয়েন্টের রাস্তা অবরোধ করছে চিনের ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’ (পিএলএ)। আপার সুবানসিরি জেলার তাকসিং সার্কেলের আসাফিলার কাছে জুলাইয়ে প্রথম সংঘর্ষ হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। সেনা সূত্রের দাবি, ভারতের প্যাট্রলিংয়ের রাস্তা আটকানোর চেষ্টা করে চিনা সেনা। সে সময়ে দু’পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। তাতে পিএলএ ফিরে গেলেও পরে আরও লোকলস্কর নিয়ে আসে। সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্রের দাবি, তাকসিং সার্কেলে কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিলিটারি আউটপোস্ট ‘মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেস’–এর কাছে এলএসি-র ৬-৭ কিলোমিটার ভিতরে উঁচু পার্বত্য এলাকায় তাঁবু ফেলেছে চিনা সেনা। সেই সূত্রের দাবি, এটি গত জুলাইয়েরই ঘটনা। তার পরে ভারতও ওই এলাকায় আইটিবিপি জওয়ানের সংখ্যা অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার পর থেকেই দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু, হালফিলে যার পারদ চড়েছে। অন্তত চারটি ফরওয়ার্ড পোস্টে এই মুহূর্তে প্যাট্রলিং ব্যাহত হচ্ছে বলে খবর।
ভারতের প্রস্তুতি
অস্ত্রের আধুকিনীকরণ এবং সেনা পরিকাঠামোয় চিন যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, তাতে গতানুগতিক রাস্তায় তাদের মোকাবিলা কঠিন বলে মনে করেন শত্রুজিৎ। সে কারণে তিনি জোর দিয়েছেন ড্রোন এবং কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি উন্নততর করার উপরে — ‘ড্রোন এমন একটি জিনিস যা দিয়ে খুব ছোট দেশও বড় একটি দেশকে বাগে আনতে পারে। রাশিয়ার মতো সুপারপাওয়ারকে এই ড্রোন দিয়েই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ইউক্রেন। ইরানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ওদের নৌসেনা নেই। তবুও স্রেফ ড্রোন ব্যবহার করে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করছে।’ ভারত কী ভাবে ড্রোন-শক্তি বাড়াচ্ছে, তার সবিস্তার তথ্য দিয়ে শত্রুজিৎ জানান, আগামী তিন বছরে চিনা সীমান্ত বরাবর ওভারগ্রাউন্ড শেল্টারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও বেশি করে আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টার তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘যে কোনও সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে ওভারগ্রাউন্ড শেল্টার হলো সহজ টার্গেট। সে কারণে আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’ ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উত্পল ভট্টাচার্য বলেন, ‘চিনের দুরভিসন্ধির কথা মাথায় রেখেই আমাদের সেনার ১৭ কোর বা ব্রহ্মাস্ত্র বিভাগ তৈরি করা হয়েছিল৷ এই বিভাগের সদস্যরা হাই অলটিটিউড ক্লাইমেটে স্ট্রাইক এবং কাউন্টার স্ট্রাইক করতে পুরোপুরি সক্ষম৷ আমি নিশ্চিত এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ট্রুপ মুভমেন্ট সেরে ফেলা হয়েছে আগেই৷’
স্পেশাল কম্যান্ডো
গলওয়ান সংঘর্ষের অভিজ্ঞতার পরে চিন সীমান্তে উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে ‘শৌর্য কম্যান্ডো ফোর্স’ তৈরি করা হয়েছে। শত্রুজিৎ বলেছেন, ‘মাউন্টেন গেরিলা ফোর্স হিসেবে আইটিবিপি তৈরি করা হয়েছিল। ২০০৪ থেকে আমরা চিন সীমান্ত রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে আসছি। এখন গেরিলা সংঘর্ষের তেমন প্রয়োজনীয়তা না-থাকলেও আমাদের মূল দায়িত্ব এবং ভূমিকা থেকে আমরা সরছি না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে আমাদের এখন নিজেদের তৈরি করতে হবে একটি হাই-অল্টিটিউড মাউন্টেন ফাইটিং ফোর্স হিসেবে, যা সেনাবাহিনী এবং বাকি সব সশস্ত্র বাহিনীর থেকে দক্ষতায় আলাদা হবে।’ সে প্রসঙ্গেই তিনি জানান, খুব দ্রুত আইটিবিপি-র হাতে সম্পূর্ণ এক প্ল্যাটুন শৌর্য কম্যান্ডো ফোর্স আসবে।
শান্তি আলোচনা
গত জুলাইয়ে অরুণাচল সীমান্তে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরে ব্রিকস সামিটে যোগ দিতে ভারতে এসেছিলেন (১১-১৩ সেপ্টেম্বর) চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শুধু তা-ই নয়, অগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে তিন দফায় সীমান্ত পরিস্থি্তি নিয়ে দু’দেশের বৈঠক হয়েছে। গত ৬ অগস্ট ৩৬তম ডব্লিউএমসিসি-র (ওয়ার্কিং মেক্যানিজ়ম ফর কনসাল্টেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন অন ইন্ডিয়া-চায়না বর্ডার অ্যাফেয়ার্স) বৈঠকের পরে ২৬ অগস্ট বেজিংয়ে বৈঠকে বসেছিলেন সীমান্ত-আলোচনা নিয়ে নিযুক্ত দু’দেশের বিশেষ প্রতিনিধিরা। সেখানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল নিজে। এর পরে গত ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচলের ভাচা-দামাই সীমান্তে পার্সোনেল মিটিং পয়েন্টে প্রথমবারের জন্য দুই সেনার কোর-পর্যায়ের বৈঠক হয়। কিন্তু তাতেও সংঘর্ষে বিরতি পড়েনি।
Ei Samay
সরকারের অবস্থান
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, সীমান্তে যাতে কোনও ‘বেহিসেবি’ ঘটনা না-ঘটে, তা নিশ্চিত করতে দু’দেশই আলোচনা চালাচ্ছে। তবে তিনি বলেছেন, ‘চিনের সেনা প্রতিষ্ঠিত প্যাট্রলিং প্যাটার্ন ভাঙলেই ভারত-চিনের সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।’
রাজনৈতিক চাপানউতোর
অরুণাচল পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসতেই কেন্দ্রের সমালোচনায় সরব হয়েছে কংগ্রেস। দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ‘চিনকে যথেষ্ট ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর সরকারের অবস্থান দেশের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। গলওয়ানে আমাদের সেনার ২০ জন বীর জওয়ানের মৃত্যুর পরেও চিনা আমদানি ১০২ শতাংশ বেড়েছে। মেক ইন ইন্ডিয়া কি ইমপোর্ট ফ্রম চায়নায় পর্যবসিত হলো?’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর অবশ্য দাবি, ভারতের সীমান্তে ঢুকে অরুণাচলের জমি কব্জা করেছে চিনা সেনা, এমন কোনও খবর নেই। তবে সীমান্তের কাছে বসবাসকারী ভারতীয়রা যে পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন, সে কথা অস্বীকার করেননি তিনি।
