সাংবাদিকতার ইতিহাসে কিছু নাম এমন, যাদের প্রতি পেশার মানুষ একধরনের শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকায়। জানেট ম্যালকম তেমনই একজন। তিনি ছিলেন দীর্ঘ প্রতিবেদন বা লংফর্ম জার্নালিজমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার; যাঁর লেখায় তথ্য, মনস্তত্ত্ব, সাহিত্য ও নৈতিক প্রশ্ন একসঙ্গে মিশে যেত। কিন্তু ম্যালকমের জীবন ও কর্ম শুধু সাংবাদিকতার শিল্প নিয়ে নয়; এটি আরও গভীর একটি প্রশ্ন তোলে—অন্যের জীবন লিখতে গিয়ে একজন লেখক কতটা সত্য বলতে পারে, আর কতটা গোপন রাখতে পারে?
এভ স্নাইডারের সাম্প্রতিক জীবনী The Absent Woman: The Genius of Janet Malcolm মূলত এই প্রশ্নকেই কেন্দ্রে রেখেছে। বইটি শুধু ম্যালকমের জীবনী নয়; এটি একই সঙ্গে আমেরিকান লংফর্ম সাংবাদিকতার উত্থান, সমৃদ্ধি ও পরিবর্তনের ইতিহাস । ম্যালকমের লেখাগুলো আজ প্রায় সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত, কিন্তু তাঁর নিজের জীবন ছিল অনেকটা রহস্যে মোড়া। তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইতেন না, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানাতেন এবং আত্মজীবনী লেখার ক্ষমতা নিয়েই সন্দেহ পোষণ করতেন ।
নির্বাসন, স্মৃতি ও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি
জানেট ম্যালকমের জন্ম ১৯৩৪ সালে প্রাগে, জানা ভিয়েনারোভা নামে। ১৯৩৯ সালে তাঁর পরিবার নাৎসি হলোকাস্ট থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে নিউইয়র্কে চলে আসে। পরিবারটি নিজেদের ‘চেক’ হিসেবেই বেশি চিনত; ইহুদি পরিচয়কে প্রকাশ্যে তুলে ধরত না । এই নির্বাসন, ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা এবং পরিচয়ের অস্পষ্টতা ম্যালকমের মনে এক ধরনের বহিরাগত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিল।
শৈশবের বিচ্ছিন্নতাই পরবর্তীকালে ম্যালকমের সাংবাদিকতার বীজ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি সমাজের ভেতরে থেকেও বাইরে থেকে দেখতেন; মানুষের কথার পেছনের অনুপ্রেরণা, অবচেতন ইচ্ছা ও লুকানো দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করতেন । তাঁর বাবা ছিলেন প্রাগের একজন নিউরোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্ট, যিনি ফ্রয়েডের চিন্তায় আগ্রহী ছিলেন। এই পারিবারিক পরিবেশ ম্যালকমের মনোবিশ্লেষণ নিয়ে দীর্ঘ আগ্রহের পেছনে ভূমিকা রাখে ।
ফটোগ্রাফি থেকে সাংবাদিকতা
ম্যালকমের সাংবাদিক জীবনের সূচনা ছিল সহজ নয়। ১৯৭৫ সালে তিনি The New Yorker-এর ফটোগ্রাফি সমালোচক হন। তার আগে তাঁকে মূলত ক্রিসমাস কেনাকাটা, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা বা শিশুতোষ বিষয়ে লিখতে বলা হতো—অর্থাৎ তৎকালীন পুরুষ-নির্ধারিত ‘নারীসুলভ’ বিষয়ে । এই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য শুধু বাধা ছিল না; এটি তাঁকে সাংবাদিকতার ক্ষমতা-কাঠামো ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বুঝতে সাহায্য করেছিল।
ফটোগ্রাফি তাঁর লেখার পদ্ধতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একজন আলোকচিত্রী যেমন ফ্রেমে কী থাকবে আর কী থাকবে না, তা নির্ধারণ করেন; ম্যালকমও তেমনি প্রতিবেদনে কোন বাক্য, কোন দৃশ্য ও কোন ব্যক্তির কথা থাকবে, তা নির্ধারণ করতেন । এই নির্বাচনের ক্ষমতাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে—লেখক যা দেখান, তা কি সত্যের পূর্ণ চিত্র, নাকি তার একটি নির্বাচিত অংশ?
মনোবিশ্লেষণ ও ‘অসম্ভব পেশা’
ম্যালকমের প্রথম বড় রিপোর্টিং ছিল পারিবারিক থেরাপি নিয়ে, যা পরে Psychoanalysis: The Impossible Profession বইয়ে রূপ নেয়। তিনি থেরাপিস্ট ও রোগীর সম্পর্ক, অভিভাবকত্বের অপরাধবোধ, মানসিক আঘাত এবং মানুষের অবচেতন আচরণ নিয়ে লিখেছেন । তাঁর লেখায় মনোবিশ্লেষণ ছিল শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান নয়; এটি মানুষের সত্য বলার, স্বীকার করার ও আত্মপ্রতারণার একটি মঞ্চ।
এরপর তিনি লিখেছেন In the Freud Archives, যেখানে ফ্রয়েডের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক এবং জেফ্রি ম্যাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এই বই নিয়ে ম্যাসন মানহানির মামলা করেন। মামলাটি শেষ পর্যন্ত ম্যালকমের পক্ষে নিষ্পত্তি হয়, তবে এটি সাংবাদিকতার ইতিহাসে উদ্ধৃতি, টেপরেকর্ড ও সাংবাদিকের দায় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নৈতিক বিতর্ক তৈরি করে ।
সাংবাদিক কি বিশ্বাসঘাতক?
ম্যালকমের সবচেয়ে বিতর্কিত রচনা The Journalist and the Murderer। এর শুরুতেই তিনি লিখেছিলেন, যে সাংবাদিক বাস্তবতা বুঝতে পারেন, তিনি জানেন—তাঁর পেশা নৈতিকভাবে অসমর্থনীয়; কারণ সাংবাদিক মানুষের আত্মবিশ্বাস, অজ্ঞতা বা একাকীত্বকে কাজে লাগিয়ে আস্থা অর্জন করেন এবং পরে তা ভঙ্গ করেন ।
এই বক্তব্য সাংবাদিকতাকে কেবল তথ্য সংগ্রহের পেশা নয়, বরং ক্ষমতা ও নৈতিক দায়ের সম্পর্ক হিসেবে দেখায়। সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় বিশ্বাস তৈরি করেন, কিন্তু প্রকাশের সময় সেই বিশ্বাস প্রায়ই ভেঙে যায়। ম্যালকমের এই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত যখন গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্য মঞ্চে নিয়ে আসছে।
‘অনুপস্থিত নারী’র দ্বন্দ্ব
ম্যালকম অন্যদের জীবন নিয়ে অসাধারণ লিখেছেন, কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে প্রায় নীরব ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পর প্রকাশিত Still Pictures: On Photography and Memory ছিল তাঁর একমাত্র প্রকৃত আত্মজীবনীমূলক রচনা । সেখানে তিনি পুরনো পারিবারিক ছবি ঘিরে স্মৃতি বিশ্লেষণ করেছেন, তবে নিজের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে সাবধান ছিলেন।
তিনি মনে করতেন, জীবনী মানুষের অন্তর্জগতের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তাঁর মতে, যে স্মৃতিগুলোতে দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ, দোষারোপ ও নিজেকে ন্যায্য দেখানোর প্রবণতা থাকে, সেগুলো প্রকাশ করা অন্যায় । এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শুধু একজন সাংবাদিক নয়, একজন নৈতিক চিন্তাবিদ হিসেবেও দাঁড় করায়।
লংফর্ম সাংবাদিকতার অতীত ও বর্তমান
ম্যালকমের যুগে ম্যাগাজিন সাংবাদিকতা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ৬০ হাজার শব্দের ফিচার, দীর্ঘ প্রোফাইল, গভীর গবেষণা ও সাহিত্যিক ভাষা—এসব ছিল সাংবাদিকতার গর্ব । কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে সংক্ষিপ্ততা, দ্রুত প্রকাশ, ভাইরালিটি ও অ্যালগরিদম-নির্ভর পাঠক আকর্ষণ মূল চাহিদা হয়ে উঠেছে। ফলে ম্যালকমের মতো লেখার ধরন এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়।
তবু তাঁর উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, সাংবাদিকতা শুধু তথ্য জানানো নয়; এটি মানুষকে বোঝার, প্রসঙ্গ তৈরি করার এবং সত্যের জটিলতা উপস্থাপনের শিল্প। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন—এই শিল্পের সৌন্দর্যের পেছনে থাকতে পারে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশ্বাসভঙ্গ এবং অন্যের জীবনকে সাহিত্যের উপকরণে পরিণত করার ঝুঁকি ।
বাংলা সাংবাদিকতার জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য ম্যালকমের কাজ কয়েকটি শিক্ষা দেয়। প্রথমত, ফিচার লেখা শুধু ঘটনার বর্ণনা নয়; এটি মানুষ, প্রেক্ষাপট ও অর্থের স্তর উন্মোচন করা। দ্বিতীয়ত, সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সাংবাদিকের সামনে সবসময় একটি নৈতিক সীমারেখা থাকে—কার কথা, কতটা এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার হবে। তৃতীয়ত, লেখকের নিজের অবস্থান লুকিয়ে রাখা সবসময় নিরপেক্ষতা নয়; কখনো তা পাঠকের কাছে বিভ্রান্তিও তৈরি করতে পারে।
জানেট ম্যালকম আমাদের শেখান, ভালো সাংবাদিকতা মানে শুধু তথ্যের সঠিকতা নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও। তাঁর লেখা ঠান্ডা, পরিষ্কার ও নিখুঁত ছিল; কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অস্পষ্ট, বিচ্ছিন্ন ও রহস্যময়। এই বৈপরীত্যই তাঁকে সাহিত্যের মতো পড়ার যোগ্য সাংবাদিক বানিয়েছে। তাঁর ‘অনুপস্থিতি’ শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যিনি অন্যের জীবন লেখেন, তাঁর নিজের জীবনও উন্মোচিত হওয়া-না-হওয়ার একটি নৈতিক প্রশ্ন।
