তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ‘মনের বন্ধু’র প্রতিষ্ঠাতা তৌহিদা শিরোপা।
‘কাউন্সেলিং জীবনের সব সমস্যার শতভাগ সমাধান দেবে, এমন নয়। তবে এর মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের পরিস্থিতি বুঝতে, বিকল্পগুলো বিবেচনা করতে এবং সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। ফলে জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি আরও সক্ষম হয়ে উঠতে পারেন।’
পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন তৌহিদা শিরোপা। পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, আমরা শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু মানসিক সুস্থতা নিয়ে আগে তেমন কথা বলতাম না। আপনি কীভাবে মনের কথা বলার একটি আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুললেন?
উত্তরে তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘আমার যাত্রাটা হঠাৎ করেই শুরু হয়েছিল। তখন আমি প্রথম আলোতে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতাম। ২০১৫ সালের দিকে আমার মায়ের অ্যাকিউট ডিপ্রেশন ধরা পড়ে। শুরুতে আমরা বুঝতে পারছিলাম না তাঁর কী হয়েছে। অনেক হাসপাতাল ঘোরার পর একজন চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাই। তখন বিষয়টি শনাক্ত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় ছয় মাসের একটি দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়ে আমরা তাঁকে সহায়তা করি। এই অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভ্রান্তি শুধু রোগীর নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও থাকে। একজন কেয়ারগিভারেরও সহায়তা প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোথায় যাব, কাকে বলব, কে গোপনীয়তা রক্ষা করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। সেই জায়গা থেকেই মনের বন্ধু তৈরির চিন্তা আসে।’
আপনার মায়ের অসুস্থতার অভিজ্ঞতা কীভাবে এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠল?
তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘মায়ের অসুস্থতার সময় আমি ও আমার ছোট ভাই তাঁকে সহায়তা করেছিলাম। তখন বুঝতে পারি, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সঠিক তথ্য এবং সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করার জায়গা প্রয়োজন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কথা ভাবি, যেখানে মানুষ জাজমেন্টের ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারবেন।’
প্রথম আলোতে কাজ করার সময় আপনি একটি ‘কনফেশন বক্স’ পরিচালনা করতেন, সেখানে মানুষের চিঠি পড়ে কী উপলব্ধি হতো?
তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘সেখানে অনেক অচেনা মানুষের চিঠি আসত। তাঁদের সমস্যা, অভিযোগ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানতাম। চিঠিগুলো পড়ে আমার সব সময় মনে হতো, মানুষ নীরবে অনেক কষ্ট সহ্য করেন। কিন্তু তাঁদের কথা বলার জায়গা নেই। মানুষ জানেন না কার কাছে যাবেন, কীভাবে যাবেন বা কাকে নিজের সমস্যার কথা বলবেন। পত্রিকায় তাঁদের কথা প্রকাশ করে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। এই উপলব্ধি থেকেই সরাসরি সহায়তার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রয়োজন অনুভব করি।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক মনের বন্ধুর জন্য প্রথম আলোর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সিদ্ধান্ত ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান।
তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘মনের বন্ধুকে এগিয়ে নিতে হলে অনেক সময় ও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে হয়েছিল আমার। চাকরি ও এই উদ্যোগ একসঙ্গে চালিয়ে গেলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব ছিল না বললেই চলে। তাই পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। তবে তখনো জানতাম না কীভাবে উদ্যোগটি এগিয়ে নেব।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সবার জন্য সহজলভ্য করার চিন্তা থেকে পোশাক কারখানার সঙ্গে কাজ শুরু করলেন কীভাবে?
তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যেন শুধু আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যেন সহায়তা নিতে পারেন। পোশাকশ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে কাজ করার চিন্তা থেকে বিজিএমইএর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তখন সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন ড. রুবানা হক। তাঁর সহায়তায় উদ্যোগটি বোর্ডে উপস্থাপন করা হয়। অনুমোদন পেতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, কারখানার মালিকেরা শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছেন, নাকি শুধু নিয়ম মেনে চলার জন্য?
তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, সেবাটি যেন শুধু নিয়ম রক্ষার উদ্যোগ হয়ে না থাকে।’ তিনি বলেন, শ্রমিকেরা সত্যিই উপকৃত হচ্ছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করার জন্য শ্রমিকদের পাশাপাশি লাইন ম্যানেজার, সুপারভাইজার ও ব্যবস্থাপনা দলের জন্যও আলাদা কর্মসূচি তৈরি করা হয়।
নতুন প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যাগুলো কি আগের প্রজন্মের তুলনায় আলাদা? জানতে চাইলে তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘এখন কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আগের চেয়ে রিলেশনশিপ নিয়ে আগ্রহ এবং নানা ধরনের প্রত্যাশা দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে সন্তান কী ভাবছে, কী অনুভব করছে, তা বোঝার জন্য মা-বাবার সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকা জরুরি।’
তরুণদের বাইরে প্রবীণ নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছেন? এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৌহিদা শিরোপা বলেন, মনের বন্ধুর সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে প্রবীণ নাগরিকেরাও রয়েছেন। বিশেষ করে যাঁদের সন্তান বিদেশে থাকেন, তাঁদের কেউ কেউ নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন। সব সময় তাঁদের বড় ধরনের মানসিক অসুস্থতা থাকে, এমন নয়। অনেকের শুধু কথা বলার একজন মানুষ প্রয়োজন হয়। সন্তানদের ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় প্রবীণ ব্যক্তিরা নিজেদের কথা বলার জায়গা খোঁজেন।
সবশেষে সঞ্চালক জানতে চান, আপনার উদ্যোগে অনেক মানুষের মনের কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আপনার নিজের মন খারাপ হলে কার কাছে যান?
তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘অন্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করি বলেই যে আমাদের নিজেদের কোনো সমস্যা হবে না, তা নয়। আমাদেরও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে, মন খারাপ হতে পারে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছি। পাশাপাশি, কাউন্সেলরদের জন্য সুপারভিশনের ব্যবস্থা আছে, যেখানে তাঁরা নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলতে পারেন। আমি মনে করি, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
