ইউছুফ আলী মিঠু : মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের নিষেধাজ্ঞা একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখা এবং দেশের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থেই প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ ধরা, পরিবহন, বিক্রি ও মজুতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনেক এলাকায় মা ইলিশ ধরা বন্ধ হচ্ছে না। নদীতে চলছে মাছ শিকার, প্রকাশ্যে বিক্রিও হচ্ছে ইলিশ। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নজরদারি কতটা কার্যকর?
মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদের ওপর বড় ধরনের আঘাত। একটি মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারলে প্রায় ২০থেকে ২৫ লাখের মত পোনা জন্ম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেই প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও নদীর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার পরিণতি শুধু বর্তমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে আগামী দিনের জেলে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তার ওপরও।
তবে এ সমস্যার পেছনে জেলেদের আর্থিক সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েন। সরকারি সহায়তা সময়মতো ও পর্যাপ্ত পরিমাণে না পৌঁছালে জীবিকার তাগিদে কেউ কেউ আইন অমান্য করার ঝুঁকি নেন। তাই শুধু অভিযান ও শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রকৃত জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে অবৈধভাবে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত নৌকার মালিক, মাছের আড়তদার, পরিবহনকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নদীতে মাছ ধরা জেলেদের আটক করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অবৈধ মাছের বাণিজ্যিক চক্র সক্রিয় থাকলে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবেই। নদীপথে নিয়মিত টহল, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি, অবৈধ মাছ কেনাবেচা বন্ধ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষ করে মেঘনা নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ-পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কোথায়, কখন এবং কীভাবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য হচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। তবে অভিযান হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত; কোনোভাবেই হয়রানি বা অনিয়মের সুযোগ রাখা যাবে না।
আবার আমরা মনে করি, মা ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের। না এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। জেলেদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করা—এই তিনটি বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, মা ইলিশ রক্ষা অভিযান ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা সফল হলে দেশে বছরে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব।
নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজে-কলমে কার্যকর থাকলে চলবে না, তার বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে নদীতে ও বাজারে। এখনো সময় আছে মা ইলিশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার । অন্যথায় আজকের অবহেলা আগামী দিনে দেশের মূল্যবান ইলিশ সম্পদের জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
মা ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, জেলেদের জীবিকা এবং নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে না পারলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব পড়বে জেলে পরিবার থেকে শুরু করে মৎস্য ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। আজ কিছু মানুষের অবৈধ মুনাফার লোভে যদি এই প্রাকৃতিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও।
তবে এ সংকটের দায় এককভাবে জেলেদের ওপর চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে সরকারি সহায়তা সময়মতো পৌঁছানো, প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। জীবিকার অনিশ্চয়তা দূর না করে শুধু অভিযান পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার পেছনে যারা অর্থ জোগায়, নৌকা পরিচালনা করে, অবৈধ মাছ কেনে এবং বাজারজাত করে—তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শুধু নদীতে মাছ ধরা ব্যক্তিকে আটক করে বড় বাণিজ্যিক চক্রকে আড়ালে রেখে দিলে আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অবৈধ মাছের সরবরাহ ও বিপণন বন্ধ করতে না পারলে নদীতে শিকারও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বিশেষ করে মেঘনা নদী ও উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি এবং প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও নৌ-পুলিশের সমন্বিত অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। তবে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের প্রশ্ন—যে নিষেধাজ্ঞা ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য, সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে? অভিযান পরিচালনার পর কতটি অবৈধ নৌকা শনাক্ত হলো, কতটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো এবং জব্দ করা মাছের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
মা ইলিশ রক্ষা কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযান নয়; এটি জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে মাছ শিকার বন্ধ করতে হবে, বাজারে অবৈধ ইলিশের বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং প্রকৃত জেলেদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
নিষেধাজ্ঞা থাকবে কাগজে, আর নদীতে চলবে মা ইলিশ নিধন—এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ, আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বাস্তব সাফল্য। মা ইলিশ বাঁচলে ইলিশের ভবিষ্যৎ বাঁচবে, আর ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানেই দেশের মৎস্যসম্পদ ও অসংখ্য মানুষের জীবিকা রক্ষা করা।
লেখক ও সংবাদকর্মী, সভাপতি কমলনগর প্রেসক্লাব, লক্ষ্মীপুর।
