আজকাল ওয়েবডেস্ক: শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে রাখা যায় না। ইন্টারনেট ব্যবহার করা শিশুদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতন এবং আপত্তিকর সামগ্রীর প্রচার রুখতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্প্রতি এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শিশুদের সুরক্ষার স্বার্থে ইন্টারনেট ব্যবহারে বয়সের ভিত্তিতে সার্বিক নিষেধাজ্ঞা জারির বিরোধিতা করেছে শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে শিশুদের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে একাধিক নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, শিশুদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। অনলাইন বিপদের আশঙ্কায় শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শিশুদের অনলাইন যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষা করা যাবে এবং একই সঙ্গে তাদের সাংবিধানিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, বয়সের ভিত্তিতে ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে শিশুরা অনিয়ন্ত্রিত এবং আরও বিপজ্জনক ওয়েবসাইটের দিকে ঝুঁকতে পারে। পাশাপাশি, অনলাইনে কোনও শিশু যৌন নির্যাতন, হুমকি বা প্রলোভনের শিকার হলে সে বিষয়টি অভিভাবক কিংবা বিশ্বাসযোগ্য কোনও প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে ভয় পেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কাও শিশুদের অভিযোগ জানানো থেকে বিরত রাখতে পারে বলে মনে করছে আদালত।
অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রী নিয়ে উদ্বেগ
ইন্টারনেটে শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রী বা চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ মেটিরিয়াল ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে নির্দেশিকা কার্যকরভাবে পালন না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এই ধরনের অপরাধের শিকার শিশুদের সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় রিডাইরেক্ট লিঙ্ক এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রীর প্রচার চালানোর অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আদালতে আলোচনা শুরু হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে এই ধরনের সামগ্রী শনাক্ত করা এবং সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা মূলত ব্যক্তিগত অভিযোগের উপর নির্ভরশীল। কোনও একটি প্ল্যাটফর্মে আপত্তিকর সামগ্রী শনাক্ত করে সরিয়ে দেওয়া হলেও, অন্য প্ল্যাটফর্মগুলিতে একই সামগ্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত হয় না। ফলে সেটি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিতে দেরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কার্যকর পদক্ষেপের জন্য আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।
জাতীয় ডেটাবেস তৈরির নির্দেশ
অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রী দ্রুত শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে জাতীয় স্তরে বিশেষ ডেটাবেস তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
এই ব্যবস্থায় পারসেপচুয়াল হ্যাশ এবং ইউআরএল-এর ডেটাবেস তৈরির জন্য নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে। পারসেপচুয়াল হ্যাশের সাহায্যে কোনও ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে মিলে যায়, এমন সামগ্রী শনাক্ত করা সম্ভব। অন্যদিকে, ইউআরএল ডেটাবেসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওয়েব ঠিকানা চিহ্নিত করতে সুবিধা হবে। এর ফলে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই আপত্তিকর সামগ্রী দ্রুত শনাক্ত করা এবং সমন্বিতভাবে সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার রুখতেও সতর্ক করেছে আদালত। শুধুমাত্র একটি অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও সামগ্রীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া কিংবা সেটিকে ডেটাবেসে যুক্ত করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন যথাযথ যাচাই এবং একাধিক সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
পাশাপাশি, ভুলবশত কোনও ছবি, ভিডিও বা ইউআরএল চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রী শনাক্ত করার জন্য তৈরি এই হ্যাশ এবং ইউআরএল ডেটাবেস অন্য ধরনের সামগ্রী সরিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
প্রাথমিক স্তর থেকেই সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্তর থেকেই সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালুর উপর জোর দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ইন্টারনেটে কী ধরনের বিপদ থাকতে পারে, কীভাবে অনলাইন হুমকি বা নির্যাতন চিনতে হবে এবং এমন পরিস্থিতিতে কার সাহায্য নিতে হবে, সে বিষয়ে শিশুদের সচেতন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে আদালত।
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সাংবিধানিক স্বাধীনতা রক্ষা করাই এই নির্দেশগুলির মূল লক্ষ্য। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুদের সুরক্ষার নামে এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যার ফলে তাদের অধিকার খর্ব হয় কিংবা যথাযথ যাচাই ছাড়াই বৈধ সামগ্রী সরিয়ে দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পরিবর্তে অনলাইন যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রী দ্রুত শনাক্ত করা, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং স্কুলস্তর থেকেই সচেতনতা গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
https://www.youtube.com/watch?v=JwFdq_tA9cE
