একটা উইকেট পড়ছে। তারপর আরেকটা! এরপর যেন খুলে গেল পতনের দরজা। একজন ব্যাটার ফিরছেন, পরেরজনও বেশিক্ষণ টিকছেন না। কেউ ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করছেন না, কেউ দায়িত্ব নিয়ে হাল ধরতে পারছেন না। প্রতিপক্ষের বোলারদের কাজটা ক্রমেই সহজ হয়ে যাচ্ছে। আর ড্রেসিংরুম থেকে মাঠে নামা প্রতিটি ব্যাটারের সামনে অপেক্ষা করছে আগেরজনের রেখে যাওয়া চাপ। এভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইনিংস-কখনো ১৬০ রানে, কখনো ২৭২ রান তাড়া করতে নেমে ৩৩.৪ ওভারেই!
ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫০ ওভার ব্যাটিং করার কথা একটি দলের। কিন্তু বাংলাদেশ যেন সেই লড়াইয়ে নামার আগেই হাল ছেড়ে দিচ্ছে। প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে নিজেদের ব্যাটিংয়ের ভঙ্গুরতা। কয়েকটি উইকেট পড়ে গেলেই আর ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না দল। প্রশ্ন উঠছে, এটা কি কেবল ব্যাটারদের অফ ফর্ম, নাকি বাংলাদেশের ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের ভেতরেই বড় কোনো কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়েছে?
সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোর দিকে তাকালে একটি চিত্র পরিষ্কার-বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে টিকে থাকার লোকের অভাব। ইনিংসের শুরুতে উইকেট পড়লে মাঝের সারির ব্যাটারদের কাছ থেকে যে দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত, তা মিলছে না। আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে কিছু রান করলেও বড় জুটি গড়ে ইনিংসকে এগিয়ে নেওয়ার দৃশ্য নেই বললেই চলে। ফলে এক প্রান্তে উইকেট পড়তে থাকলে অন্য প্রান্তের ব্যাটারও চাপের মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। একসময় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা রূপ নিচ্ছে দলীয় বিপর্যয়ে।
পরিসংখ্যান সেই দুর্বলতাকেই আরও স্পষ্ট করছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাইফ হাসান ও ইমনের ৯৩ রানের জুটিই ছিল সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের একমাত্র ৫০ রানের বেশি জুটি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বোচ্চ জুটি ছিল ৪৭ রানের। ওয়ানডেতে ম্যাচ জিততে হলে শুধু কয়েকজন ব্যাটারের বিচ্ছিন্ন ভালো ইনিংস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একাধিক কার্যকর জুটি, যারা পরিস্থিতি বুঝে কখনো রান তুলবেন, কখনো উইকেট আগলে রাখবেন। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সেই সমন্বয় অনুপস্থিত।
সমস্যার আরেকটি জায়গা মিডল অর্ডার। ওপেনারদের ওপর নির্ভরতা এতটাই বেশি যে, শুরুতে ধাক্কা এলেই পুরো ইনিংসের ভিত নড়ে যায়। অথচ ওয়ানডেতে মিডল অর্ডারের কাজই হলো ইনিংসের মাঝের সময়টা সামলানো। টপঅর্ডার ভালো শুরু করলে সেটিকে বড় সংগ্রহে রূপ দেওয়া, আর শুরুটা খারাপ হলে ইনিংস মেরামত করা। বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই হিমশিম খাচ্ছে। উইকেট হাতে রেখে শেষের দিকে ঝড় তোলার পরিকল্পনা তো দূরের কথা, অনেক সময় মাঝের ওভারগুলোতেই ইনিংস শেষ হয়ে যাচ্ছে।
লিটন দাসের অনুপস্থিতি নিশ্চয়ই দলের জন্য বড় ধাক্কা। অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যাটারের না থাকা ব্যাটিংয়ের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিই কি এমন বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ? আন্তর্জাতিক মানের একটি দলের বিকল্প ব্যাটারদেরও দায়িত্ব নেওয়ার কথা। একজন খেলোয়াড় না থাকলে অন্যরা সেই শূন্যতা পূরণ করবেন-এটাই দলীয় ক্রিকেটের নিয়ম। বাংলাদেশ সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই সমস্যাটি শুধু একজনের অনুপস্থিতিতে আটকে নেই; বরং বিকল্পদের প্রস্তুতি, ব্যাটিং অর্ডারের কার্যকারিতা এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ব্যর্থতা কোনো এক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টানা চার হারের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতে সর্বশেষ সাত ম্যাচে জয় মাত্র একটিতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও সর্বশেষ সাত ম্যাচে জয় মাত্র দুটি। প্রতিপক্ষের ধরন বদলালেও বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দুর্দশা বদলাচ্ছে না। ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৩৩.৪ ওভারে অলআউট হওয়া কিংবা আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৬০ রানে গুটিয়ে যাওয়া-দুটি ফলের পেছনেই রয়েছে একই রোগ: ইনিংস ধরে রাখতে না পারা।
এখানে কেবল ব্যাটারদের টেকনিক কিংবা ফর্ম নিয়ে আলোচনা করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। দল হিসেবে বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিকল্পনাতেও অসংগতি রয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে খেলতে হবে, উইকেট হারানোর পর কীভাবে রান তোলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কোন ব্যাটার ইনিংস ধরে রাখবেন আর কে আক্রমণ করবেন-এসবের স্পষ্ট প্রয়োগ মাঠে দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিপক্ষের চাপ বাড়লেই বাংলাদেশ নিজেদের পরিকল্পনা হারিয়ে ফেলছে। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, কিন্তু তার প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ব্যাটিং অর্ডার বদলানো কিংবা দু-একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়াই সমাধান নয়। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। মিডল অর্ডারে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার তৈরি করতে হবে, ব্যাটারদের পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার অভ্যাস গড়তে হবে, আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জুটি গড়ার মানসিকতা ফিরিয়ে আনা। ব্যক্তিগত রান নয়, দলীয় ইনিংসকে কীভাবে ৫০ ওভার পর্যন্ত টেনে নেওয়া যায়-সেই শিক্ষা জরুরি।
সামনে এশিয়া কাপ, এরপর বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। বড় মঞ্চে ভালো করার স্বপ্ন দেখার আগে বাংলাদেশকে নিজেদের ব্যাটিংয়ের আয়নায় তাকাতে হবে। কারণ, প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই শুরু হওয়ার আগেই যদি নিজেদের উইকেট বিলিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে জয়ের পরিকল্পনা কাগজেই থেকে যাবে!
