ঐতিহ্যবাহী লাল ও হলুদ কার্ডের সনাতন পদ্ধতি পেছনে ফেলে ফুটবল মাঠে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘ইলেকট্রনিক কার্ড’ ব্যবহারের ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছে উরুগুয়ে। দেশটির ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ‘কোপা উরুগুয়ে’-তে নাসিওনাল ও রেন্তিস্তাসের মধ্যকার ম্যাচে পরীক্ষামূলকভাবে এই বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ম্যাচে খেলোয়াড়দের সতর্ক করতে সাধারণ প্লাস্টিকের কার্ডের বদলে মুঠোফোনের মতো দেখতে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র উঁচিয়ে ধরেন ম্যাচ রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। ম্যাচ চলাকালে রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা এবং খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাজনিত প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করাই এই উদ্ভাবনের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পটির নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘রেফে’ (আরইএফই)। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাউরো সাক্কো এবং সহ-পরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা জানান, প্রায় তিন বছর আগে বৃষ্টির মধ্যে একটি ম্যাচ দেখার সময় রেফারিদের হাতে লিখে কার্ডের তথ্য নথিভুক্ত করার ভোগান্তি দেখে তাঁদের মাথায় এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ভাবনা আসে। নতুন এই ইলেকট্রনিক কার্ডের মাধ্যমে মাঠে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি সফটওয়্যারে নথিভুক্ত হয়ে যায়, যার সুবাদে ম্যাচ শেষে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘কমেট’-এ দ্রুত ও নিখুঁত ম্যাচ রিপোর্ট জমা দেওয়া সম্ভব হবে। প্রথমবার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রেফারি ভারেলা বলেন, কার্ড দ্রুত উঁচিয়ে ধরার সনাতন আবেগ কিছুটা কমলেও প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে এটি রেফারিদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।
তবে মাঠের বাস্তবতায় ডিভাইসটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু দৃশ্যমানতার চ্যালেঞ্জও পরিলক্ষিত হয়েছে। এর আগে সূর্যের কড়া আলোয় স্ক্রিনের লেখা বা রং অস্পষ্ট থাকায় একটি পরীক্ষামূলক ম্যাচ মাঝপথে স্থগিত করতে হয়েছিল। সদ্য সমাপ্ত ম্যাচেও গ্যালারিতে থাকা সাধারণ দর্শক এবং টেলিভিশনের পর্দায় খেলা দেখা দর্শকদের পক্ষে স্ক্রিনের রং বা সিদ্ধান্ত দূর থেকে পুরোপুরি পরিষ্কার বোঝা কিছুটা কঠিন ছিল। প্রযুক্তিটির সহ-পরিচালক দে লা পেনা জানিয়েছেন, এটি এখনও উন্নয়নের প্রাথমিক ধাপে রয়েছে এবং সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যতে যন্ত্রটির চারপাশে উজ্জ্বল এলইডি আলো যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে মাঠ ও টেলিভিশন—উভয় মাধ্যমেই হলুদ কিংবা লাল রঙের সংকেত সবাই স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
উরুগুয়ের ঘরোয়া ফুটবলে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই একে ফুটবলের ইতিবাচক আধুনিকায়ন হিসেবে সাধুবাদ জানালেও অনেকেই সনাতন কার্ডের আবেদন নষ্ট হওয়ার কথা বলে ট্রল ও নানা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। তবে এসব প্রতিক্রিয়ায় বিচলিত নন উদ্ভাবক মাউরো সাক্কো; তাঁর মতে, যেকোনো নতুন প্রযুক্তি মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়।
ঘরোয়া পর্যায়ে প্রাথমিক ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ডিভাইসটির দৃশ্যমানতা ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত দিক আরও উন্নত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সব ত্রুটি দূর করে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার পর অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কাছে এই ‘ইলেকট্রনিক কার্ড’ প্রযুক্তির প্রস্তাবনা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্ভাবকদের।
