সেখানে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেখেন—“Allah the Almighty is the best planner of my life. Thanks to Allah.”
বুয়েট পড়ুয়া শিক্ষক নায়লা শারাফকে প্রশংসাপত্র পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উচ্চ বেতনের চাকরি ও বিসিএস ক্যাডার পদের লোভ ছেড়ে নেত্রকোণার প্রান্তিক শিশুদের আলোর দিশারী হয়ে ওঠেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রশংসাপত্র পাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত আলো থেকে তাকে দূরে রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
রাষ্ট্রীয় এই বিরল সম্মান ও দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসার জোয়ারে বেশ আপ্লুত এই শিক্ষক। তবে এতকিছুর মাঝেও তিনি আঁকড়ে থাকতে চান তার নিরিবিলি, অনাড়ম্বর জীবন।
গত ৫ অক্টোবর গণমাধ্যমে এই শিক্ষককে নিয়ে একটি বিশেষ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাকে একটি অফিসিয়াল প্রশংসাপত্র পাঠানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাক্ষরিত ওই পত্রে শিক্ষক নায়লা শারাফকে বলা হয়, ‘ব্যতিক্রমী কাজের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যে অনন্য হয়ে উঠেছেন। স্বউদ্যোগে তার এ ধরনের কাজই আজ তাকে সবার সঙ্গে পরিচিত করেছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমার মতো আরও অনেকেই আপনার কাজে অনুপ্রাণিত হবে। দেশ এবং জনগণের স্বার্থে আপনার এ ধরনের ইতিবাচক কার্যক্রমে আমি আনন্দিত।’
হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ গঠনে প্রতিটি নাগরিকের নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়, যার যার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজ উন্নয়নে সচেষ্ট হলে একটি কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। নায়লার এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে যে কোনো সহায়তার জন্য সরকারের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয় ওই পত্রে। পরিশেষে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে নায়লা শারাফ তার ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রী প্রেরিত পত্রের ছবিসহ একটি পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেখেন—“Allah the Almighty is the best planner of my life. Thanks to Allah.”
এমন অর্জনে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে শিক্ষক নায়লা শারাফ বলেন, আমি তো আসলে খুব ক্ষুদ্র একজন মানুষ। আমি কখনো ভাবিওনি যে আমাকে নিয়ে কখনো নিউজ হতে পারে। আমার প্রত্যাশা ছিল খুব বেশি হলে হয়তো আমার মৃত্যুর পর কোনো স্টুডেন্ট আমাকে নিয়ে লিখতে পারে—যদি ওরকম কোনো স্টুডেন্ট আমি তৈরি করে যেতে পারি! যাই হোক, জীবদ্দশায় আমাকে প্রধানমন্ত্রী যে সম্মানটুকু দিয়েছেন, সেজন্য আমি আসলেই কৃতজ্ঞ।
নিজের এই অর্জনের পুরো কৃতিত্ব সাংবাদিকদের দিয়ে তিনি বলেন, আমি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ আমার মিডিয়ার রিপোর্টার ভাইদের কাছে। আমি একজন প্রচারবিমুখ মানুষ, আমার অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপনারা আমাকে নিয়ে নিউজ করেছেন। আপনাদের সেই পজিটিভ নিউজের কারণেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমার গলিতে বা পাশের বাড়ির লোকেরাও অনেকে জানতেন না যে আমি বুয়েটের স্টুডেন্ট বা এত বড় বড় চাকরি ছেড়ে প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করি। তাদের কাছে আমার পরিচয় ছিল কেবল একজন প্রাইমারি স্কুল টিচার। কিন্তু আপনারা আমাকে একজন সার্থক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আজকের এই সফলতায় আমার নিজের প্রাপ্তি বা কৃতিত্ব কিছুই নেই, সবটুকু অবদান আপনাদের। আপনারা সুন্দরভাবে উপস্থাপন না করলে প্রধানমন্ত্রীও জানতে পারতেন না, দেশবাসীও অনুপ্রেরণা পেত না, আর আমিও এই গৌরব অর্জন করতে পারতাম না।
তবে গণমাধ্যমের অতিরিক্ত প্রচার ও মানুষের কৌতুহল থেকে অব্যাহতি চেয়ে তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, আমাকে নিয়ে আর নিউজ করার দরকার নেই ভাই। আমার সেই শান্তির জীবনটা ফিরিয়ে দিন। ১০ দিন আগে আমি যেমন ছিলাম, তেমনই থাকতে চাই।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে এলজিইডিতে প্রকৌশলী এবং জনতা ব্যাংকে ‘এক্সিকিউটিভ অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নায়লা শারাফ ৩৪তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তবে ক্ষমতার মোহ ও যান্ত্রিক জীবনের পরিবর্তে শিশুদের নিবিড় ভালোবাসা ও সামাজিক নীতি-নৈতিকতার পাঠ দিতে তিনি বেছে নেন শিক্ষকতার পেশা। নেত্রকোণা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দীর্ঘ সাত বছর ধরে তিনি নিঃস্বার্থভাবে প্রান্তিক শিশুদের মাঝে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
