সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরেই দেশজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের নারী শ্রমিকেরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাকরি নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই নিয়োগকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা ধর্ষণসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পুরুষরাও অনেক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে অসংখ্যবার।
বাংলাদেশের মানুষ দরিদ্র। বিদেশে গেলে পরিবারের অভাব ঘুচবে, অনেক টাকা পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা থেকেই বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের।
ইউরোপে যাওয়ার জন্য জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে বাংলাদেশের তরুণেরা। অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছে এই যাত্রাপথে। রাশিয়ায় যাওয়ার ঝোঁক বেড়েছে আজকাল। চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়ে জীবন হারাতে হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণদের। কিন্তু কেন এত বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা?
কারণ দেশে কর্মসংস্থান নেই। নেই উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ ও সমর্থন। সৌদি আরবে গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি পেয়েছিলেন সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডের শিকার হওয়া ওই বাংলাদেশি দুই তরুণ-তরুণী। তরুণের বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি ছয়-সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠান।
প্রশ্ন হলো, একজন তরুণ এই ছয়-সাত লাখ টাকা দিয়ে দেশে কি কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারতেন না? নিশ্চয়ই পারতেন। দরকার ছিল সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ। দরকার ছিল স্থানীয় সরকারের সহযোগিতা।
চীনে অনেক বছর বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এখানে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সরকার থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করা হয়। একসময় ইউননান ছিল চীনের একটি দারিদ্র্যপীড়িত প্রদেশ। কিন্তু এখন তারা জনগণকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কীভাবে সম্ভব হলো? আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে। এখানে গ্রামের ও শহরের অসংখ্য মানুষ ছোট ছোট ব্যবসা করছে, ছোট কৃষি খামার চালাচ্ছে। কারুশিল্পের ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সহায়তা করছে স্থানীয় সরকার। যারা ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প সামগ্রী তৈরি করেন, তাদের সেইসব পণ্য বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থাও করছে সরকার। পাশাপাশি রয়েছে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ। স্কুল পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা কোনো না কোনো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণ করেন। যিনি সাহিত্য পড়ছেন, তিনিও এমন কোনো টেকনিক্যাল কাজ জানেন যার মাধ্যমে চাকরি না পেলেও নিজের কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উপার্জন করতে পারবেন।
বাংলাদেশে এখন দরকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ ও সহায়কমূলক নীতি। চাঁদাবাজি, মাদক ও অন্যান্য অপরাধমূলক তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করা দরকার। কারণ অপরাধীরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নির্যাতন করে, তাদের ব্যবসা পরিচালনায় বাধা দেয়, পুঁজি ছিনিয়ে নেয়। দেশে যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে বিদেশে গিয়ে প্রাণ হারানোর সংখ্যা কমবে। আরও দরকার দালালের মাধ্যমে মানবপাচার বন্ধ করা। বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও দরকার। প্রশিক্ষিত শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে সারা বিশ্বে। জেলা পর্যায়ে যুব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার ব্যাপক হারে। এর ফলে বিদেশে যারা যাবেন, তারা হবেন দক্ষ শ্রমিক। এই প্রশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিকদের সরকারি উদ্যোগে বৈধভাবে বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করে তারপর পাঠাতে হবে। যে দেশে শ্রমশক্তি পাঠানো হবে, সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাসকেও এদের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো সেসব দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখবে, বাংলাদেশিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে।
সৌদি আরবে যে দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো, তারা বছর তিনেক জেলখানায় বন্দী ছিলেন। বিচারপ্রক্রিয়া চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে। অথচ বাংলাদেশের দূতাবাস বিষয়টি জানতই না। এত অবহেলা নিজের দেশের নাগরিকদের প্রতি? অথচ এরাই কিন্তু রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
জনশক্তি রপ্তানির বেলায় নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করাটাও কিন্তু অতি জরুরি কাজ। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেখানে বাংলাদেশি নারীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে বছরের পর বছর অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, সেখানে তাদের না পাঠালেই কি নয়?
গৃহকর্মী হিসেবে নারীদের এসব দেশে না পাঠিয়ে বরং নার্সিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্যান্য দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিশুর যত্ন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে সেবাদান ইত্যাদি বিভিন্ন সেবামূলক খাতে জনশক্তির প্রয়োজন বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। এই ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠালে তারা উপার্জনও বেশি করতে পারবে, আর নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ও থাকবে না।
বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবনের মূল্য কি এতই কম যে যুদ্ধের ময়দানে মরার জন্য, সাগরে ডোবার জন্য, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার জন্য আর পাচার হওয়ার জন্য দেশ ছেড়ে ভিনদেশে তাদের যেতেই হবে?
বাংলাদেশের দক্ষ, প্রশিক্ষিত শ্রমজীবী মানুষ হোক বিশ্ব গড়ার শক্তি। তারা নিজেদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটাক এবং দেশকেও বৈদেশিক মুদ্রায় সমৃদ্ধ করুক। পাশাপাশি রপ্তানি হোক আমাদের দেশজ পণ্য। রপ্তানিমুখী অর্থনীতি ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক যুবসমাজের। আর কোনো সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীকে যেন ভিন দেশে এমন করুণ মৃত্যুবরণ করতে না হয়।
শান্তা মারিয়া: শিক্ষক, বাংলাভাষা বিভাগ, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন। ইমেইল: shantamariavalia@gmail.com
