
অস্থিত্ব সংকটে জীবনানন্দ দাশের পৈত্রিক ভিটা
২২ অক্টোবর রূপসী বাংলার প্রখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৫৪ সালের ২২অক্টোবর জীবনানন্দ দাশ পরলোক গমন করেন। তার পৈত্রিক বাড়ী ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়নের বামনকাঠি গ্রামে। বামনকাঠি এলাকায় কবির পৈত্রিকভিটা অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। এমনকি জীবনানন্দ দাশের কবিতার বিখ্যাত সেই ধানসিঁড়ি নদী আজ অস্তিত্ব হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু পর্যটক জীবনানন্দের জন্মভিটা দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
জীবনানন্দ দাশ তার শৈশব থেকে কৈশোর এমনকি যৌবনের অনেক সময় পার করেছেন রাজাপুরের এই বামনকাঠি এলাকায়। ওই সময়ই কবি ধানসিঁড়ি নদীর প্রেমে পড়েন। এরপর তার বহু লেখনীতে ধানসিঁড়ি নদীর রূপ নিয়ে তিনি লেখেন। কবির লেখনীতে সেই ধানসিঁড়ি নদী পরিচিতি পায় দেশ-বিদেশে। কিন্তু কালের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী। একসময়ের খরস্রোত ধানসিঁড়ি নদী এখন মরা খালে পরিনত হয়েছে। বছর চারেক আগে নামে মাত্র খনন করা হয়েছে। ধানসিঁড়ি নদীর পাড়েই নির্মান করা হয়েছে জীবনানন্দ দাশ সংগ্রহশালা ও পাঠাগার। কিছুটা হলেও ফিরেছে ধানসিঁড়ি নদীর যৌবন।
রাজাপুর থেকে ঝালকাঠি গাবখান পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটারের অর্ধেকেরও বেশি অংশ রয়েছে অস্থিত্ব সংকটে। নদীর এই অংশে বর্তমানে কচুরিপানায় ভরাট হয়ে পানি প্রবাহও প্রায় বন্ধের পথে। বর্ষা মৌসুমে পাঁচ থেকে ছয় ফিট পানি থাকলেও বছরের বেশিরভাগ সময়ে নদী থাকে শুকনো।
অপরদিকে ধানসিঁড়ি নদীর পার্শ্ববর্তী বামনকাঠী এলাকায় জীবনানন্দ দাশের পৈত্রিক ভিটেও আজ জঙ্গলঘেরা। বিস্তৃর্ণ ধানক্ষেত আর মেঠো পথের এক প্রান্তে কোন মতে দাঁড়িয়ে আছে সেটি। কিছু গাছপালা ও একটি পুকুর ছাড়া অবশিষ্ট আর কিছুই নেই সেখানে। বছর চল্লিশ আগেও পূর্বপুরুষরা এখানে বসবাস করতেন। সবকিছু ছেড়ে কলকাতা পাড়ি জমিয়েছেন তারাও। তবে স্থানীয়দের কাছে এখনও ওই বাড়িটি ‘দাশের ভিটা’ নামে পরিচিত।
বামনকাঠি এলাকার সত্তরোর্ধ রমজান আলী বলেন, চল্লিশ বছর আগেও দাশের বাড়িতে অধি দাশ ও ভোলা দাশ নামে জীবনানন্দ দাসের দুই বংশোধর বসবাস করতেন। ওই সময় একটি ডাকাতির ঘটনায় দুই ডাকাত গনপিটুনিতে নিহত হওয়ার পর তারা পুলিশি হয়রানির ভয়ে দেশ ছেড়ে ভারত চলে গেছেন। এরপর থেকে ছাড়া ভিটায় পরিনত হয়েছে কবির জন্মস্থানটি।’
বামনকাঠি এলাকার আলী সিকদার বলেন, কলকাতাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু লোক আমাদের এখানে জীবনানন্দ দাশের বাড়ি দেখতে আসে। কিন্তু তারা শুধু জঙ্গল দেখে ফিরে যায়। আমরাও বিব্রত হই। আমাদের দাবী জীবনানন্দ দাশের বাড়িটিতে একটি স্মৃতি ফলক দিয়ে এটি সংরক্ষনের উদ্যোগ নেয়া হোক।’
রাজাপুর সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রভাষক মোঃ সোহরাব হোসেন দীর্ঘ দিন গবেষনা করেছেন কবিকে নিয়ে এবং তার স্বজনদের খোঁজে একাধিকবার কোলকাতায় গিয়ে তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি আরো জানিয়েছে কবির পূর্ব পুরুষদের বাড়ী ফরিদপুর জেলায়। সেখানে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে কবির দাদা সদানন্দ দাস তার তিন ছেলেকে নিয়ে এই বামনকাঠি গ্রামের সেন বাড়ীতে আশ্রয় নেয় এবং এখানেই সর্বানন্দ দাসের ঘরে ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী কবি জীবনানন্দ দাশের জন্ম হয়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরী বলেন, আপনারা জানেন ইতো মধ্যেই জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী খনন করা হয়েছে এবং ধানসিঁড়ি নদীর পাড়ে রূপসী বাংলার কবিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তার স্মৃতি রক্ষায় জীবনান্দ দাশ সংগ্রহশালা ও পাঠাগার নির্মান করা হয়েছে। শীঘ্রই তার পৈর্তৃক ভিটা সংরক্ষনের জন্য সংস্কিৃতি মন্ত্রনালয় বরাবরে আবেদন করা হবে।
