নিজস্ব প্রতিবেদক
দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চারটি এলএনজি কার্গো নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আগস্টে এসব কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও ১৭ আগস্ট পর্যন্ত একটিও আসেনি। কবে কার্গোগুলো পৌঁছাবে, তাও নিশ্চিত নয়। ফলে দেশে গ্যাস সরবরাহের সংকট শিগগিরই পুরোপুরি কাটছে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে দুটি কার্গোর জন্য দরপত্রে প্রস্তাব পাওয়া গেলেও বাকি তিনটির জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দর দেয়নি।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে প্রায় ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়। টার্মিনাল সমস্যার কারণে আগস্টে নয়টি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে, দুটি দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং চারটি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দরপত্রের মাধ্যমে কেনা তিনটি কার্গোর মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহ করেছে। আরেকটি ২০ আগস্ট আসার কথা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকেও একটি কার্গো পাওয়া গেছে। তবে সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসা একটি কার্গো টার্মিনালে স্থানান্তরের ঝুঁকির কারণে গ্রহণ করা হয়নি।
সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চার কার্গোর মধ্যে দুটি সরবরাহের দায়িত্ব ছিল হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির। তবে কোম্পানিটির প্রস্তাবিত একটি জাহাজ যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় সেটি গ্রহণে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ওই জাহাজ গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ ও কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অন্য কার্গোগুলোর সরবরাহের সময়ও এখনো নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বরে সরবরাহের অনুমতি চাইতে পারে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেনি। তাদের কার্গো না আসায় বিকল্পভাবে দরপত্রের মাধ্যমে নতুন এলএনজি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
### কম দামে কেনা নিয়ে প্রশ্ন
আগস্টের শুরুতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল, ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি এবং হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির কাছ থেকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাস ধরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২০ ডলারের বেশি। ১৭ আগস্ট দাম ছিল প্রায় ২২ ডলার। এর বিপরীতে ব্ল্যাককিউব প্রতি ইউনিট ১৫ দশমিক ৫০ ডলার এবং ঝেনইউ ১৪ দশমিক ৯৫ ডলারে সরবরাহের প্রস্তাব দেয়।
এলএনজি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারদরের তুলনায় এত কম দামে প্রস্তাব পাওয়ার পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, কার্গোর উৎস এবং ব্যবহৃত জাহাজ সম্পর্কে আরও সতর্কভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ না হলে চুক্তি অনুযায়ী জামানত বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছে বলেও তারা জানান।
### জরুরি দরপত্রেও সব কার্গো মিলছে না
সরাসরি ক্রয়ে কেনা কার্গোগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে সরবরাহের জন্য পাঁচটি কার্গো কিনতে জরুরি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৩-২৪ আগস্ট এবং ৪-৫ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য দুটি কার্গোর দর পাওয়া গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই সর্বনিম্ন দরদাতা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি), যার প্রস্তাবিত দাম প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২২ ডলার। অন্য তিনটি কার্গোর জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়নি। এসব কার্গোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও খোলাবাজার—দুই উৎস থেকেই এলএনজি আমদানি করে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এসব উৎস থেকেও নিয়মিত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি সৌদি আরামকোর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিও রয়েছে।
### গ্যাস সরবরাহ আবার কমছে
কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। তবে নতুন কার্গো না আসায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ আবার কমতে শুরু করেছে।
দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ গত শুক্রবার ১৬৪ কোটি ঘনফুটে নেমে গেলেও শনিবার তা বেড়ে ২৪২ কোটি ঘনফুট হয়। রোববার সরবরাহ ছিল ২৪০ কোটি এবং সোমবার তা কমে ২২৮ কোটি ঘনফুটে দাঁড়ায়। ওই দিন এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় প্রায় ৬৬ কোটি ঘনফুট।
গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও হবিগঞ্জের কয়েকটি শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তবে গাজীপুরের কিছু এলাকা ও সাভারের কয়েকটি কারখানায় এখনো গ্যাস সংকট রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা। সংকটের সময়ে নির্ধারিত কার্গো সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
