বিশ্ববাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ারে দরপতনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর। গত ছয় মাসে দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর স্টার ৫০ সূচক প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। এতে প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগানোর চীনের পরিকল্পনা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বড় চিপ নির্মাতা মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস সাংহাই ও মুর থ্রেডস টেকনোলজির শেয়ারের দাম একই সময়ে প্রায় অর্ধেক কমেছে। অন্যদিকে, হার্ডওয়্যারনির্ভর চিনেক্সট সূচক কমেছে ৩৬ শতাংশ।
অথচ বছরের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে চীনা সরকারের নানা উদ্যোগ এবং বিশ্বজুড়ে এআইয়ের চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীরা দেশটির প্রযুক্তি শেয়ারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন। এর ফলে এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে স্টার৫০ সূচক প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়ে যায়, যা দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকের প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় এবং এআই প্রযুক্তির প্রকৃত চাহিদা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যায়নে থাকা শেয়ারগুলোতে বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দেয়।
গাভেকাল ক্যাপিটালের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক লিওনিদ মিরোনভ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রযুক্তি শেয়ারের দরপতন চলতে থাকলে চীনের এআই খাতের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। ছয় মাসের বেশি সময় বাজার দুর্বল থাকলে কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন মূলধন সংগ্রহ করা কঠিন হবে। পাশাপাশি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষক জেসন লিয়াও ও মারভিন চেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চীনের প্রযুক্তি শেয়ারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্ববাজারে এআই হার্ডওয়্যার খাতের শেয়ারে দরপতন শুরু হলে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।
হংকংয়ের মাধ্যমে চীনের স্থানীয় শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া একটি ব্যবস্থার আওতায় তৃতীয় প্রান্তিকে আনুমানিক ৯০ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার করা হয়েছে। এক বছরে এটিই সর্বোচ্চ অর্থ প্রত্যাহারের ঘটনা। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে আসা বিদেশি বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ এর ফলে বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে।
দরপতনের প্রভাব পড়েছে সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপরও। মেমোরি চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটি করপোরেশনের শেয়ার জুলাইয়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সর্বোচ্চ দরের তুলনায় ২৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, রোবট নির্মাতা ইউশু টেকনোলজির শেয়ার আগস্টে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পর সর্বোচ্চ দরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ হারিয়েছে।
শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও চীনের এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। স্টার৫০ সূচকের কোম্পানিগুলোর শেয়ার বর্তমানে ভবিষ্যৎ মুনাফার তুলনায় ৪০ গুণের বেশি দরে লেনদেন হচ্ছে। তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকের ক্ষেত্রে এই অনুপাত পাঁচ গুণের কম এবং নাসডাক ১০০ সূচকের ক্ষেত্রে ২১ গুণ।
গ্যাম ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক জিয়ান শি কর্তেসি মনে করেন, বর্তমান দরপতনকে সস্তায় শেয়ার কেনার সুযোগ হিসেবে না দেখে বাজারের একটি কারিগরি সংশোধন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাঁর ধারণা, সম্ভাবনাময় অনেক প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম আরও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমলে তবেই আকর্ষণীয় দামে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, চীনের এআই খাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও শেয়ারবাজারের অস্থিরতা, বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং কোম্পানিগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সূত্র: এজ মালয়েশিয়া
খুলনা গেজেট/উউরা
