অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বিভিন্ন প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে চীন-সংশ্লিষ্ট আন্তর্দেশীয় দমন-পীড়নের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে দেশটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।
এক বিবৃতিতে মার্কিন দূতাবাস বলেছে, ‘অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে চীন-সংশ্লিষ্ট আন্তর্দেশীয় দমন-পীড়নের যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক।’
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিক্রিয়া এল। অস্ট্রেলীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা প্রবাসী জনগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশটিতে বসবাসরত ব্যক্তিদের ওপর চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা তাঁদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করতে পারে।
অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ ডটকম ডটএইউকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এএফপির কমান্ডার ম্যাথিউ গেইল বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘটনা অনেক সময় কমিউনিটির প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাবিত করার আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেই চাপ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি ক্রমে হয়রানি কিংবা হুমকির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
গেইল ব্যাখ্যা করেন, বিদেশি পক্ষগুলো প্রভাবশালী কমিউনিটি নেতাদের কাছে গিয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতে পারে। তবে কেউ তাদের কথায় সাড়া না দিলে চাপ আরও বাড়তে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অস্ট্রেলিয়ার বাইরে বসবাসরত কোনো ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়াও একটি কৌশল হতে পারে। এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিবর্তনে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।
গেইল বলেন, বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে বৈধ কূটনৈতিক যোগাযোগ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে গোপনীয়তা, প্রতারণা কিংবা জবরদস্তিমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে তা বিদেশি হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পড়ে।
অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও গুপ্তচরবৃত্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশটিতে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমও হয়েছে।
বিদেশি হস্তক্ষেপের সন্দেহজনক ঘটনা তদন্তে এএফপি অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এএসআইও) এবং ফাইভ আইজ গোয়েন্দা জোটের অংশীদারসহ আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করে।
গেইলের মতে, বিদেশি পক্ষগুলো প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে থাকা পারস্পরিক আস্থা ও পরিচিতির সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় বৃহত্তর কমিউনিটির সদস্যরা বুঝতেও পারেন না যে তাঁদের পরিচিত কেউ এমন চাপের শিকার হচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়ার আদালতে বিদেশি হস্তক্ষেপসংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনা ইতিমধ্যে বিচারিক পর্যায়ে গড়িয়েছে। আলেকজান্ডার সারগো অস্ট্রেলিয়ার ফৌজদারি আইনের ৯২.৩ ধারায় বেপরোয়া বিদেশি হস্তক্ষেপের অপরাধে দণ্ডিত প্রথম ব্যক্তি। আদালতের কার্যক্রমে চীনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের কাছে প্রতিবেদন সরবরাহের দায়ে তাঁকে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মেলবোর্নের সাবেক কমিউনিটি নেতা ডি সান ‘সানি’ ডুয়ং বিদেশি হস্তক্ষেপের অপরাধ সংঘটনের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগে একই আইনের ৯২.৪ ধারায় প্রথম বিচারের মুখোমুখি হন এবং কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। মামলাটিতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ফেডারেল মন্ত্রী অ্যালান টাজের সঙ্গে প্রভাব বিস্তারের সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টার বিষয়টি উঠে আসে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে ব্রিসবেনে বসবাসরত এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কথিত গুপ্তচরবৃত্তির ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল।
কর্তৃপক্ষের তদন্তাধীন এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা শুধু গোপনে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে সম্পর্ক তৈরি ও ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও এর আওতায় আসতে পারে।
গেইল বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ পেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত হতে পারেন। তিনি জনগণকে হুমকি, হয়রানি কিংবা জবরদস্তিকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে তথ্য জানা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি হস্তক্ষেপের সন্দেহ হলে দেশটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি হটলাইনের ১৮০০ ১২৩ ৪০০ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। পরিচয় গোপন রেখেও অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে।
সূত্র: অস্ট্রেলিয়া টুডে
এমএস/
