গাইবান্ধা সদর উপজেলায় নতুন করে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ১৩ জনের মধ্যে ১২ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। বাকি একজন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী। তাঁদের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকেও ডিলার হতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আবেদনকারী। তাঁরাও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির নেতারা। মনোনীত ব্যক্তিদের কয়েকজনের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাঁরা ডিলার হয়েছেন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার এক চিঠিতে ১৩ জনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে বিএনপি, যুবদল, কৃষকদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী রয়েছেন। বাকি একজন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী। মনোনীত কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয় দলীয় নেতাদের পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। তবে বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন।
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। পাশাপাশি আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাকোয়াত হোসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ভাই ভাই ট্রেডার্স। তিনি একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, এর আগে তিনি সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
অন্যদিকে, একই ইউনিয়নের বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এবার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম নেই।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। সব নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে মনোনীত করা হয়নি। অথচ এমন একজনকে ডিলার করা হয়েছে, যিনি আগে সার ব্যবসা করেননি। বিষয়টি তাঁর কাছে হতাশাজনক। এ সব কিছু টাকার বিনিময়ে করা হয়েছে।
এদিকে, ঘাগোয়া ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ ও গুদাম অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন মনোনয়নবঞ্চিত ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। এ বিষয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর ২টায় গাইবান্ধায় বাংলাদেশ তৃণমূল কল্যাণ সোসাইটির জেলা কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদনও জমা দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত লিখিত বক্তব্য ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঘাগোয়া ইউনিয়নে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ভাই ভাই ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাকোয়াত হোসেনের গুদামটি সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, গুদামটির আয়তন মাত্র ৪৫২ বর্গফুট। এ ছাড়া এর মেঝেতে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে এবং মেঝে দেবে গেছে। ফলে গুদামটি রাসায়নিক সার সংরক্ষণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ডিলারশিপের জন্য জমা দেওয়া ট্রেড লাইসেন্স ও আয়কর রিটার্নের কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। গাইবান্ধা সদর কার্যালয়ের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজমির হোসেন অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে গুদামটিকে উপযুক্ত উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি আরও দাবি করেন, সরেজমিনে যথাযথ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করায় প্রকৃত ও যোগ্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ কারণে সার ডিলার নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সংশ্লিষ্ট গুদামটি সরেজমিনে পুনরায় পরিদর্শন, জমা দেওয়া নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই এবং সার ডিলার নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসকের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের লাইসেন্স বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে, কৃষকদের জীবন-জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। তবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে এ মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা মন্তব্য দেননি।
উল্লেখ্য, লিখিত আবেদনের অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব, গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়।
এমএ
