সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন- যখন তার ঘোষিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দেশের জনগণের কাছে সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি একই সঙ্গে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সৌদি অ্যারাবিয়াস এমবিএস ইজ ফেসিং হিজ গ্রেটেস্ট চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বিশ্লেষণে এই পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেছে। যেখানে মূল প্রশ্ন হলো—নিজের নেতৃত্বের ভিত্তি হিসেবে যে নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এমবিএস সামনে এনেছেন, ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে তিনি কতটা তা বাস্তবায়ন করতে পারবেন?
২০১৫ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এমবিএস সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। ২০১৭ সালে যুবরাজ হওয়ার পর তার হাতে ক্ষমতা আরো কেন্দ্রীভূত হয়। তার নেতৃত্বে দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন, বিনোদন, প্রযুক্তি, শিল্প, লজিস্টিকস ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই রূপান্তরের প্রধান কর্মসূচি হলো ‘ভিশন ২০৩০’, যার লক্ষ্য অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং সৌদি নাগরিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু ২০২৬ সালের আঞ্চলিক সংঘাত, নিরাপত্তা অবকাঠামোর ওপর হামলার ঝুঁকি, জ্বালানি ও বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নসংক্রান্ত চাপ এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) জুলাই ২০২৬-এর মূল্যায়নেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাণিজ্য বিঘ্ন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঝুঁকি এবং সরকারি ব্যয়ের স্থায়িত্বকে সৌদি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এমবিএসের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে কার্যকর প্রশাসন, অর্থনৈতিক সুযোগ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা।
নিরাপত্তা: উন্নয়নের পূর্বশর্ত, এখন বড় পরীক্ষা
সৌদি আরবের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজপরিবারের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে রাষ্ট্র নাগরিকদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ দেবে—এমন একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রত্যাশার রয়েছে। সৌদি আরবের তরুণ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা ও অসন্তোষের বিষয়টিও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হুথি হামলায় ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়। হামলার পর ফ্লাইট বাতিল ও অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এই ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা-ভাবনার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং দক্ষ পেশাজীবীদের কাছে দেশটিকে নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
তবে এই নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জকে কেবল একটি হামলার তাৎক্ষণিক প্রভাব দিয়ে বিচার করা যাবে না। আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পর্যটন, বিমান চলাচল, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় প্রভাবিত হতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যয়ও উন্নয়ন খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংঘাতের বিস্তার সীমিত রাখা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। কারণ দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এমন একটি অর্থনৈতিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার জন্য বিপুল বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ভিশন ২০৩০: সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও পুনর্বিন্যাস
২০১৬ সালে ঘোষিত ভিশন ২০৩০ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি। এর লক্ষ্য তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, বিনোদন, শিল্প, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ানো। পাশাপাশি নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শ্রমবাজারে সংস্কার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও এই কর্মসূচির অংশ।
এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির প্রমাণ রয়েছে। আইএমএফের ২০২৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সৌদি আরবের মোট দেশজ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অংশ ২০১৬ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫১ শতাংশ হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অবদানও বেড়েছে। একই সময়ে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের সংস্কার অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে তেলনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবের অ-তেল রপ্তানি অ-তেল জিডিপির ২২ শতাংশে ছিল, যেখানে ২০৩০ সালের লক্ষ্য ৫০ শতাংশ। অ-তেল অর্থনীতির আকার বাড়লেও রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতি প্রয়োজন।
বৃহৎ প্রকল্পের অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিওম, দ্য লাইন, পর্যটনকেন্দ্র এবং নতুন নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কিন্তু নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়নের প্রয়োজন, প্রত্যাশিত মুনাফা এবং বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্লেষণে বৃহৎ প্রকল্পের গতি ও পরিসর পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এই বাস্তবতায় প্রকল্পের আকার বা ঘোষিত বিনিয়োগের পরিমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অর্থনৈতিক সুফল। কোন প্রকল্প কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, কতটা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, স্থানীয় শিল্পকে কতটা শক্তিশালী করছে এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে কী পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি আয় তৈরি করছে—এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরকারি অর্থের চাপ
সৌদি আরবের অর্থনীতির শক্তি হলো বিপুল জ্বালানি সম্পদ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল এবং তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী আর্থিক খাত। কিন্তু এই সক্ষমতা সীমাহীন নয়। ভিশন ২০৩০-এর বড় প্রকল্পগুলোতে সরকারি বিনিয়োগ, আমদানি এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় ও আয়কে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইএমএফের জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সৌদি আরবের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ১ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অ-তেল জিডিপির প্রবৃদ্ধিও ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে সংস্থাটি ধারণা করেছে। এগুলো পূর্বাভাস, চূড়ান্ত ফলাফল নয়।
একই মূল্যায়নে ২০২৬ সালে সৌদি আরবের সরকারি বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। ২০২৫ সালে এই ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ ঘাটতি কমার সম্ভাবনা থাকলেও সরকারের ব্যয়, বিনিয়োগ এবং রাজস্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে এমবিএস প্রশাসনের সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং নতুন শিল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে; অন্যদিকে এমন প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ আটকে রাখা যাবে না, যেগুলোর অর্থনৈতিক সুফল অনিশ্চিত বা বাস্তবায়ন ব্যয় অত্যধিক।
আইএমএফ সৌদি আরবকে সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতকে অধিক ভূমিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিলের অর্থ আরও বাছাই করে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের পুনর্বিন্যাসকে ভিশন ২০৩০ থেকে সরে আসা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পের গতি ও ব্যয় নির্ধারণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসূচিটির আর্থিক স্থায়িত্ব বাড়তে পারে।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন
এমবিএসের নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরবের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো। তার নেতৃত্বে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র আরও সুসংহত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অনেক উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছে। একই সঙ্গে এত বড় রূপান্তরের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নীতিগত ভুল সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব বড় প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত করতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেলে, বিনিয়োগের হিসাব প্রত্যাশা অনুযায়ী না মিললে কিংবা কোনো নীতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি করলে স্বাধীন মূল্যায়ন ও সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনিক দ্রুততা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
সৌদি আরবের সংস্কার কর্মসূচির সাফল্য তাই শুধু নতুন নগর, পর্যটনকেন্দ্র কিংবা প্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা দক্ষ, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা তথ্যনির্ভর, জনস্বার্থের অভিযোগ কীভাবে বিবেচিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ফলাফল কতটা স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা হয়—এসবও রূপান্তরের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করবে।
এখানে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ও অর্থনৈতিক ফলাফলকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। কোনো সংস্কারের ফলে বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান বাড়লে সেটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রমাণ হতে পারে; কিন্তু তা নিজে থেকেই সব ধরনের শাসনগত প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
তরুণ জনগোষ্ঠী: চাপের পাশাপাশি বড় সম্ভাবনা
সৌদি আরবের জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামো এমবিএসের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও দায়িত্ব তৈরি করেছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা হলো মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, উন্নত জীবনযাত্রা এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পথ। রাষ্ট্রের সংস্কার কর্মসূচি এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে তা অর্থনৈতিক রূপান্তরের সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
ভিশন ২০৩০-এর অধীনে পর্যটন, খেলাধুলা, বিনোদন, ডিজিটাল সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, লজিস্টিকস এবং আধুনিক উৎপাদনশিল্পে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণও শ্রমবাজারের কাঠামো বদলাচ্ছে। আইএমএফের মূল্যায়নে এসব পরিবর্তনকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিন্তু নতুন খাত তৈরি হলেই সব তরুণ উপকৃত হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, চাকরির মান এবং বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা বড় বিবেচ্য বিষয়। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি নাগরিকদের দক্ষতা অনুযায়ী চাকরিতে যুক্ত করা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, এমবিএসের জন্য প্রকৃত সাফল্যের একটি মাপকাঠি হবে—তরুণদের কতজন মানসম্মত ও টেকসই কর্মসংস্থান পাচ্ছেন, নতুন শিল্পে স্থানীয় কর্মীদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সৌদি আরবের নতুন অর্থনৈতিক পরিচয়
তেল রপ্তানিকারক রাষ্ট্রের পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করা এমবিএসের অন্যতম লক্ষ্য। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান—এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়া—লজিস্টিকস, বাণিজ্য ও পরিবহন খাতে বড় সম্ভাবনা তৈরি করে। জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সক্ষমতার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার বা সরকারি প্রণোদনা দেখেন না। তাঁরা রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, প্রকল্পের সম্ভাব্য মুনাফা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও বিবেচনা করেন। আইএমএফের মতে, সৌদি আরবে কাঠামোগত সংস্কার অগ্রসর হলেও উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা জরুরি। আন্তর্জাতিক কোম্পানির উপস্থিতি তখনই দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে, যখন তার সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশের ভেতরে মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হবে।
আঞ্চলিক কূটনীতি: সংঘাত এড়ানোই অর্থনৈতিক কৌশল
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, ইয়েমেনের সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতা দেশটির জ্বালানি রপ্তানি, বিনিয়োগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
আইএমএফের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিকল্প জ্বালানি পরিবহন অবকাঠামো, বৈদেশিক রিজার্ভ এবং আর্থিক সক্ষমতাকে সংকট মোকাবিলার সহায়ক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বাস্তবতায় সৌদি নেতৃত্বের জন্য সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা ও কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো, বাণিজ্যপথ সচল রাখা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখার অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে।
সৌদি আরবের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জ্বালানি বাজারে তার গুরুত্ব দেশটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব রাখার সুযোগ দেয়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে কূটনীতি শুধু নিরাপত্তা নীতির অংশ নয়, বরং ভিশন ২০৩০-এর অর্থনৈতিক লক্ষ্য রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠতে পারে।
সামনে কোন পথে এমবিএস?
এমবিএসের সামনে এখন মূলত তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত কাজ রয়েছে। প্রথমত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সৌদি আরবের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, ভিশন ২০৩০-এর উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর মধ্যে বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুফলকে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির মাধ্যমে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীল পরিবেশ। পাশাপাশি প্রকল্পের ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয়, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন কৌশল পরিবর্তন করার সক্ষমতাও জরুরি।
সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা ও গত এক দশকের সংস্কার থেকে বোঝা যায়, দেশটির সামনে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের বাস্তব সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার নির্ভর করবে তেলনির্ভরতা কমানোর গতি, আঞ্চলিক সংঘাত মোকাবিলা, বিনিয়োগের মান এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরির ওপর।
মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্ব
মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বের আগামী অধ্যায়কে শুধু তার রাজনৈতিক ক্ষমতার স্থায়িত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করলে সৌদি আরবের সামনে থাকা বৃহত্তর পরিবর্তনগুলো অনুধাবন করা যাবে না। তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া ভিশন ২০৩০ দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো, সামাজিক জীবন এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি বড় প্রচেষ্টা। এ কর্মসূচিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি যেমন রয়েছে, তেমনি আর্থিক স্থায়িত্ব, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব ঝুঁকিও রয়েছে।
২০২৬ সালের পরিস্থিতি এমবিএসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা তৈরি করেছে: নিরাপত্তার চাপ ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে সংস্কারের গতি বজায় রাখা যায়, আবার সরকারি অর্থের স্থায়িত্ব ও জনগণের প্রত্যাশার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা যায়। প্রকল্পের আকার বড় করা নয়, বরং সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করাই হবে এই পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।
শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের রূপান্তরের সাফল্য নির্ভর করবে দেশটি তেলের আয়কে কতটা টেকসই উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপ দিতে পারে, কতটা দক্ষ ও কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও কতটা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে পারে, তার ওপর। এমবিএসের সামনে চ্যালেঞ্জ বড়; একই সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পদ, অবস্থান ও সংস্কার-অভিজ্ঞতার কারণে সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য।
তথ্যসূত্র: দ্য জাপান টাইমস, ব্লুমবার্গ ও আইএমএফ
