ভয় দেখানোর চেনা ফর্মুলা আর জাম্প-স্কেয়ারের কৌশল ছেড়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রে হরর ঘরানায় এখন নতুন রূপান্তরের ছোঁয়া লেগেছে। চলতি ২০২৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোতে নিছক আতঙ্ক সৃষ্টির বদলে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, পরাবাস্তবতা ও মানবীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ বছর স্বল্প বাজেটের সিনেমা ‘ব্যাকরুমস’ ও ‘অবসেশন’ যেমন বক্স অফিসে অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে, বিপরীতে ‘স্ক্রিম ৭’ ও ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার্স-চ্যাপ্টার ৩’-এর মতো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির বহুল আলোচিত সিকুয়েলগুলো দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। প্রচলিত ছক ভেঙে তৈরি হওয়া বেশ কয়েকটি হরর চলচ্চিত্র তাদের ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী ও গভীর জীবনবোধের কারণে এ বছর দর্শক ও সমালোচকদের বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নতুন ধারার এসব চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ভিডিও গেম ফ্র্যাঞ্চাইজি অবলম্বনে নির্মিত ‘রেসিডেন্ট ইভিল’। নিজের আগের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বারবারিয়ান’ ও ‘ওয়েপনস’-এর তুলনায় একেবারে ভিন্ন আবহ নিয়ে আসা নির্মাতা জ্যাক ক্রেগার এ ছবিতে হরর ঘরানায় নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছেন; যেখানে জম্বিদের তাড়ার ভীতিকর পরিবেশেও মূল অভিনেতা অস্টিন আব্রামসের চরিত্রের পরিমিত হাস্যরস দর্শকদের স্বস্তি এনে দেয়। অন্যদিকে পরিচালক অ্যাডিসন হাইম্যানের ‘টাচ মি’ চলচ্চিত্রে এলিয়েন বা ভিনগ্রহবাসীকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দেওয়া হয়েছে। মাদক, যৌনতা, জাপানি সিনেমা ও আশির দশকের হিপহপের মতো পপ-কালচারের নানা উপাদান নিয়ে অলস জীবনযাপন করা দুই বন্ধুর সঙ্গে এক এলিয়েনের অদ্ভুত সম্পর্কের মাধ্যমে সিনেমাটিতে শেষ পর্যন্ত মানবজাতির অস্তিত্বের এক অপ্রত্যাশিত লড়াই তুলে ধরা হয়েছে।
ধ্রুপদি ভৌতিক গল্পের স্বাদ ফিরিয়ে এনে প্রশংসিত হয়েছে পরিচালক ড্যামিয়েন ম্যাকার্থির ‘হোকাম’। আয়ারল্যান্ডের একটি স্যাঁতসেঁতে ও রহস্যঘেরা হোটেলে ওহম চরিত্রে অভিনেতা অ্যাডাম স্কটের মনস্তাত্ত্বিক আত্মোপলব্ধির পাশাপাশি অতিপ্রাকৃত ঘটনার লড়াই দর্শককে এক অস্বস্তিকর ভয়ের মুখোমুখি করে। এছাড়া পরিচালক জেন শোনব্রুনের ‘ডেথ অ্যাট ক্যাম্প মিয়াজম’ ছবিটিতে রোমান্টিক কমেডির সঙ্গে ক্লাসিক স্ল্যাশার ঘরানার চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। হান্না আইনবাইন্ডার ও গিলিয়ান অ্যান্ডারসনের চমৎকার অভিনয়ের রসায়ন ছাড়াও কাউন্টিং ক্রোজের গানের আবহে রক্তক্ষয়ী গণহত্যার দৃশ্য এবং বৈচিত্র্যময় পপ সংস্কৃতির উপাদান সিনেমাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
বক্স অফিসে আলোড়ন তোলা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘অবসেশন’-এ বন্ধুত্বের গণ্ডিতে আটকে পড়া আধুনিক প্রেমের সংকটের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে লোকগাথা ‘মাঙ্কিজ প’-এর অতিপ্রাকৃত রহস্য। অভিনেত্রী ইন্দি নাভারেত্তের দারুণ অভিনয় এবং গল্পের অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়গুলো দর্শকদের ভেতর দীর্ঘমেয়াদে ভাবনার খোরাক জোগায়। সার্বিকভাবে ২০২৬ সালের উল্লেখযোগ্য হরর সিনেমাগুলো প্রমাণ করেছে যে, ভয়ের প্রকৃত শক্তি কেবল অশুভ শক্তির আকস্মিক উপস্থিতিতে নয়, বরং মানুষের গভীর মানসিক অস্থিরতা, অপরাধবোধ ও সম্পর্কের অন্তর্দহনেও লুকিয়ে থাকে।
