দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও পূর্ব তিমুরে কয়েক মাস ধরে চলা বায়ুদূষণের কারণে স্কুল বন্ধ হয়েছে, শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেড়েছে এবং বাইরে চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) এএফপিকে মালয়েশিয়ার শাহ আলম শহর থেকে রাজধানীর উদ্দেশে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া ৩৯ বছর বয়সী শিক্ষক জুল হাফিজ বলেন, ‘এটা বন্ধ হওয়া দরকার।’ এ সময় তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানকে (ASEAN) পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।
১১টি দেশ নিয়ে গঠিত এ জোটের আসিয়ান স্পেশালাইজড মেটিওরোলজিক্যাল সেন্টার (এএসএমসি) শুক্রবার তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তারা ‘দক্ষিণ আসিয়ান অঞ্চলের জন্য সতর্কতা স্তর ৩’ জারি করেছে। চার স্তরের সতর্কতাব্যবস্থায় এটিই সর্বোচ্চ স্তর।
অঞ্চলটিতে আন্তসীমান্ত ধোঁয়াশার তীব্র ঝুঁকি দেখা দিলে এ সতর্কতা জারি করা হয়। টানা দুই বা তার বেশি দিন ধরে বিস্তীর্ণ এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন ধোঁয়াশা দেখা গেলেই কেবল এ সতর্কতা দেয়া হয়।
এএসএমসির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এরই মধ্যে দুবার তৃতীয় স্তরের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শনিবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বড় শহরগুলোর তালিকায় আইকিউএয়ারের (IQAir) সরাসরি হালনাগাদ করা র্যাঙ্কিংয়ে বাগদাদের পর দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিঙ্গাপুর। তৃতীয় স্থানে ছিল কুয়ালালামপুর। তালিকার সবগুলো শহরেই বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’।
‘দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’
ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টায় শনিবার ইন্দোনেশিয়া জানায়, দেশটির দক্ষিণ সুমাত্রা প্রদেশের অন্যতম প্রধান একটি বিমানবন্দরে তারা শুষ্ক বরফ ব্যবহার করেছে।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা জানায়, উড়োজাহাজ থেকে ২ দশমিক ৪ টন শুষ্ক বরফ ছড়ানো হয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ‘ধোঁয়া শুধু দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয় এবং উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় না, এটি বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।’
ধোঁয়াশার কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা নতুন করে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কুয়ালালামপুরে এএফপিকে ৩৩ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা খাইরুল আজহার বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে মালয়েশিয়ার প্রতি কিছুটা অন্যায় করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সাপ্তাহিক ছুটির দিনের রুটিনে প্রভাব ফেলছে। শুধু আমাদের নয়, অনেক মালয়েশীয়ের ক্ষেত্রেই এমনটা হচ্ছে।’
ইন্দোনেশিয়ার পালাংকারায়ায়ও শনিবার বাসিন্দারা ধোঁয়াশার প্রভাবের কথা জানিয়েছেন। শহরটি আগুনের অন্যতম কেন্দ্রস্থলের অংশ। সেখানে ঘন ধোঁয়াশায় আকাশের রং হয়ে উঠেছিল হলুদ ও কমলার ভয়াবহ আভা।
ইন্দোনেশিয়ার অনেক মানুষের মতো ৩৮ বছর বয়সী মেকানিক মারজুকিও শুধু এক নামেই পরিচিত। তিনি বলেন, “ধোঁয়াশা আমাদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর। আমাদের আয় কমে যাচ্ছে।”
তিনি এএফপিকে বলেন, “এখন এমনিতেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব কঠিন। ধোঁয়াশা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলছে।” তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে ধোঁয়াশার বড় প্রাদুর্ভাবের সময়ের চেয়েও এ বছরের পরিস্থিতি খারাপ।
তিনি বলেন, “আশা করি, শিগগিরই বৃষ্টি হবে, আগুন নিভে যাবে এবং ধোঁয়া দূর হবে। তাহলে আবার স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করা যাবে এবং জীবিকা নির্বাহ করাও সহজ হবে।”
‘আর কী করার আছে?’
৫১ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক জোকো বলেন, আয় হারানোর ঝুঁকি এড়াতে কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।জোকো বলেন, “ঘন ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং চোখ জ্বালা করে। কিন্তু আর কী করার আছে? এভাবেই তো আমাদের জীবিকা চলে।” তিনি জানান, তার নির্দিষ্ট কোনো আয় নেই। দৈনিক মজুরির কাজের ওপরই তাকে নির্ভর করতে হয়।
আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব তিমুরে শনিবারও অস্বাস্থ্যকর মাত্রার বায়ুদূষণ অব্যাহত ছিল। রাজধানী দিলিতেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে।
কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, শনিবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ কারণে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।
সিঙ্গাপুর শুক্রবার জানিয়েছে, আগুনের জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত ইন্দোনেশিয়ার সাতটি কোম্পানিকে সতর্কবার্তা দেয়া হবে।
আসিয়ানবিষয়ক ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ডমিনিক জেভিয়ার ইম্পেরিয়াল শুক্রবার বলেন, আগামী নভেম্বরে ম্যানিলায় আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকগুলোতে ধোঁয়াশার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
