জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া এবং একজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। গত ১৩ অক্টোবর সকালে তিনি কারামুক্ত হন। ছয়দিন পর ১৯ অক্টোবর কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে তার কারামুক্তির খবর প্রচার করা হয়।
তবে এতদিন পর তার মুক্তির খবর সামনে আসার কারণ জানা যায়নি। কারা কর্তৃপক্ষের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আবজালুল হকের কারামুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তা গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানান, গত ১৩ অক্টোবর সকালেই কারাগার থেকে বের হন শেখ আবজালুল হক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার পর আদালতের রায়ে ক্ষমা পাওয়া আবজালুলের কারামুক্তির মধ্যদিয়ে তার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। আবজালুল হক আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই। আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনিও আসামি। ওই মামলায় তিনি রাজসাক্ষী বা অ্যাপ্রুভার হিসেবে সাক্ষ্য দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম বলেন, মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার সময় কাঠগড়ায় থাকা আসামিদের কাছে তারা দোষী, নাকি নির্দোষ—তা জানতে চাওয়া হয়। তখন আবজালুল হক নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের মামলায় সহযোগিতা করতে চান বলে আদালতের কাছে আবেদন জানান। পরে ট্রাইব্যুনাল তাকে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার অনুমতি দেন। মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের সময় তিনি সাক্ষ্য দেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে রায়ে রাজসাক্ষী হিসেবে সহযোগিতা করার কারণে তাকে ক্ষমা করা হয়। মিজানুল ইসলাম বলেন, তাকে যেহেতু রায়ে ক্ষমা করা হয়েছে, তাই তার আগেই কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু এত দেরিতে কেন কারামুক্তির খবর পাওয়া গেল, তা আমাদের জানা নেই। আবজালুল হকের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা চলমান আছে কি না, সে বিষয়েও তার জানা নেই বলে জানান এই প্রসিকিউটর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন আশুলিয়া থানা এলাকায় গুলি করে ছয়জনকে হত্যা এবং তাদের লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
তাদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত অবস্থায় ছিলেন; তাকেও পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সাতজনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়। নিহতদের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন, আস-সাবুর, তানজিল মাহমুদ, বায়েজিদ বোস্তামী ও আবুল হোসেনের নাম রয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন- ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস এবং ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি উত্তর) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন। মামলায় বাকি দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিআলো/অর্নব