ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে পাকিস্তান। দেশটির সামরিক বাহিনীর মিডিয়া উইং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এ কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না পাকিস্তান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন দেশের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করা হবে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, রবিবার (১৮ অক্টোবর) প্রচারিত ‘ইন্ডিপেনডেন্ট আরাবিয়া’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর এই মুখপাত্র এসব কথা বলেন। মূলত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতি যোদ্ধাদের প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
অবশ্য যৌথভাবে সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে পাকিস্তান ও সৌদি আরব দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট। দ্বিতীয় জোটে তুরস্কও রয়েছে।
হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরবকে পাকিস্তান কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইএসপিআর মহাপরিচালক বলেন, সৌদি আরবের ‘সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা’ পাকিস্তানের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই; পাকিস্তানের কাছে এটি সম্পূর্ণ অনড় অবস্থান। তাই এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা-ই দেয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, কোনো জোটই সাধারণত কী ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে এবং তার পরিমাণ কত—এসব তথ্য বিস্তারিত প্রকাশ করে না। সৌদি আরবে হুতিদের হামলার বিষয়ে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে এই সামরিক মুখপাত্র বলেন, ‘পাকিস্তানে আমাদের প্রতিক্রিয়া— রাস্তায় থাকা তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব পর্যন্ত সবার মধ্যেই সৌদিতে হুতিদের এই হামলা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে।’ কোনো সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কেন সৌদি আরবে হামলা চালাবে, দেশটিকে হুমকি দেবে, পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে কিংবা সেগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলার মতো কাজ করবে?
পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ‘যদি-কিন্তু’ চলতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের সহায়তা কেবল প্রতিরক্ষামূলক থাকবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইএসপিআর মহাপরিচালক বলেন, জোটের তিন সদস্যই এ বিষয়ে ‘সম্পূর্ণ স্পষ্ট’ যে জোটটির কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই; এটি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক জোট।
জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি বলেন, যৌথ প্রতিরোধের এই ব্যবস্থা ‘অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী শক্তিগুলোকে খুব শক্তিশালী ও স্পষ্ট বার্তা দেয়। আর তা হচ্ছে—তিনটি দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ চালানো হলে তার জবাব সম্মিলিতভাবে দেয়া হবে। এই প্রতিরোধব্যবস্থা কাজ না করলে তিনটি দেশের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করে তা আবার কার্যকর করতে হবে।
সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুতিদের সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতার কথা বলার পর তেহরানকে এ বিষয়ে কোনো ‘সতর্কবার্তা’ দেয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, পাকিস্তান ইরানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য সংযম নিশ্চিত করা এবং উত্তেজনা কমানো।
পাকিস্তানের এই সামরিক মুখপাত্র বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সব ধরনের যোগাযোগ ও আলোচনার লক্ষ্য হলো উত্তেজনা প্রশমিত করা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী বলেন, ‘এই সংঘাতে আপনি একধরনের ওঠানামার ধারা দেখতে পাচ্ছেন। কখনো কখনো উত্তেজনা কমে আসে, এরপর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা সক্রিয় হয় এবং পরিস্থিতিকে আবার উত্তপ্ত করে তোলে।’
তার মতে, এ ধরনের উত্তেজনা বাড়িয়ে সংঘাতের সমাধান হবে না। তিনি বলেন, ‘আপনি সংঘাতকে হুতিদের কাছে ছড়িয়ে দিন কিংবা অন্য কোথাও নিয়ে যান—তাতে কোনো লাভ নেই। এতে শুধু তারাই লাভবান হয়, যারা এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা চায়।’
আইএসপিআর মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘তবে একই সঙ্গে পাকিস্তান খুব জোরালো বার্তা দিচ্ছে যে যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে এবং ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং হারামাইন শরিফাইন—অর্থাৎ দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেব।’
তিনি বলেন, উত্তেজনা বাড়ানোর সঙ্গে সামনে থেকে কিংবা পেছন থেকে যারা জড়িত, সবার কাছেই এই বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকির বিষয়ে আইএসপিআর মহাপরিচালক বলেন, সৌদি আরব একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে। এতে পাকিস্তানের একজন নৌ কর্মকর্তা উপকমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সৌদি আরব ও মুসলিম বিশ্বের প্রতি তার বার্তা জানতে চাইলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী বলেন, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব সংঘাতের বিস্তার বা তীব্রতা বাড়িয়ে কোনো দেশই লাভবান হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একে অপরের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একই বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মক্কা চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশকারীদের বিষয়ে আইএসপিআর মহাপরিচালক বলেন, ‘যাদের এই জোট নিয়ে সমস্যা আছে, সংশয় প্রকাশ করছেন কেবল তারাই। তাই এর সমালোচনা করাটা তাদের কাজ।’
জোটের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে পাকিস্তানের এই সামরিক মুখপাত্র বলেন, যৌথ প্রতিরোধের নীতিতে বিশ্বাসী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত—এমন অন্য দেশগুলোর জন্যও জোটে যোগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে।
মিশর ও সিরিয়া এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী বলে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তিন দেশের রাজনৈতিক, কৌশলগত ও সামরিক নেতৃত্বের।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের অধীনে একটি জরুরি বৈঠক করে। বৈঠকে সৌদি আরবে দ্রুত সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েনের বিষয়ে সম্মত হয় দেশ তিনটি।
যৌথ বিবৃতিতে নির্দিষ্ট করে কোনো হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সৌদি আরবে হুথিদের হামলার প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়।
খুলনা গেজেট/উউরা
