৩১ মিনিট আগে
![]()
রবিউল কমল
ছবি: সংগৃহীত
জীবনে সুখী হতে হলে কি আরও বেশি টাকা, আরও বড় বাড়ি কিংবা আরও বেশি সাফল্য দরকার? সুইডেনের একটি জীবনদর্শন বলছে, না। জীবনে যতটুকু যথেষ্ট, তা বুঝতে পারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সুখের বড় একটি রহস্য। এই দর্শনের নাম ‘লাগোম’। এর সহজ অর্থ হলো, না বেশি, না কম; বরং যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু বা পরিমিত থাকলেই হলো। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিয়েস্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে সুখী দেশের তালিকায় সুইডেনের অবস্থান পঞ্চম।
লাগোম মানে ঠিক যতটুকু প্রয়োজন
লাগোম সুইডেনের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ধারণা। এর মূল কথা হলো, কোনো কিছুই প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত না করা। খাবার, কাজ, বিশ্রাম কিংবা কেনাকাটা সব ক্ষেত্রেই পরিমিতিবোধ রাখা। অর্থাৎ, কোনো কিছু কম করাও ঠিক নয়, আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি করাও জরুরি নয়। যে পরিমাণে কাজটি ভালোভাবে করা যায়, সেই পরিমাণটুকুই যথেষ্ট।
ধরা যাক, দুপুরের খাবার খেতে বসে কেউ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খাবার নিল। পরে সেই খাবার আর খাওয়া হলো না, নষ্টও হলো। অথচ খাবারটি অন্য কেউ খেতে পারত। তবে লাগোম অনুযায়ী, যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু নেওয়াই ভালো। এতে খাবারের অপচয় কমে, অন্যের প্রয়োজনের কথাও ভাবা যায়।

নিজের পাশাপাশি অন্যের কথাও ভাবা
কেবল নিজের প্রয়োজন মেটানোর কথা বলে না লাগোম। বরং অন্যদের কথাও ভাবতে শেখায়। কোনো কিছু নিজের জন্য নিতে গিয়ে অন্যের অসুবিধা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। নিজের আনন্দের পাশাপাশি অন্যের আনন্দের কথাও মনে রাখা জরুরি।
যেমন, পরিবারের সবাই মিলে একটি কেক কাটা হলো। কেউ যদি নিজের জন্য অর্ধেক কেক নিয়ে নেয়, তাহলে অন্যদের ভাগে খুব সামান্যই থাকবে। কিন্তু কেকটি সবার মধ্যে ভাগ করে দিলে প্রত্যেকেই আনন্দ করে খেতে পারবে। তার মানে নিজেকে একটু সংযত করলেই সবাইকে খুশি করা যায়। লাগোমের ভাবনাটি এমনই, নিজের প্রয়োজন বুঝতে হবে, তবে অন্যের প্রয়োজন ভুলে গেলে চলবে না।
প্রকৃতির ক্ষেত্রেও এই দর্শনের গুরুত্ব রয়েছে। খাবার, পানি ও জ্বালানির অপচয় কমানো কেবল নিজের জন্য নয়, সবার জন্যই ভালো। কলের পানি অকারণে ছেড়ে না রাখা, প্রয়োজন না হলে বাতি ও পাখা বন্ধ করা, খাবার নষ্ট না করা; এসব ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে মূল্যবান সম্পদ বাঁচানো সম্ভব। প্রয়োজন বুঝে ব্যবহার করলে পরিবেশের ওপর চাপও কমে।

বেশি পেলেই কি বেশি সুখ?
নতুন কিছু কিনলে কিংবা কাঙ্ক্ষিত কোনো জিনিস পেলে আনন্দ হয়। কিন্তু সেই আনন্দ সব সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিছুদিন পর নতুন জিনিসটির প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। তখন আবার অন্য কিছু পাওয়ার ইচ্ছা জাগে। এভাবে একের পর এক নতুন জিনিসের পেছনে ছুটতে থাকলে চাওয়ার যেন শেষ থাকে না।
ধরা যাক, কারও কাছে একটি ভালো মোটরসাইকেল আছে। সেটি দিয়ে সে ঘুরতে যায়, অফিস করে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। কিন্তু অন্য কারও আরও দামি মোটরসাইকেল দেখে যদি নিজেরটা খারাপ মনে হতে শুরু করে, তাহলে আগে যে আনন্দ ছিল তা কমে যেতে পারে। অথচ মোটরসাইকেলটি আগের মতোই ভালো আছে। কেবল বদলে গেছে সেটির প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি।
লাগোম অনুযায়ী, অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের জীবনকে বিচারের দরকার নেই। তারচেয়ে যা আছে তার আনন্দ উপভোগ করতে হয়। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে গল্প করা, পছন্দের বই পড়া কিংবা বিকেলে একটু হাঁটতে বের হওয়া; এসব সাধারণ মুহূর্তও আনন্দের কারণ হতে পারে।
সুখ সব সময় দামি জিনিসের মধ্যে থাকে না; অনেক সময় তা লুকিয়ে থাকে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়ের মধ্যে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে বড় স্বপ্ন দেখা বা জীবনে উন্নতি করার চেষ্টা বন্ধ করে দিতে হবে। নতুন কিছু শেখা, ভালো ফল করা কিংবা নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা অবশ্যই করা উচিত। তবে সেই চেষ্টার মধ্যে যেন বিশ্রাম, সম্পর্ক ও মানসিক শান্তির জায়গাটুকু হারিয়ে না যায়। সাফল্য অর্জন করতে গিয়ে শরীর ও মনের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের জীবনে লাগোমের চর্চা
লাগোম মেনে চলার জন্য বড় কোনো পরিবর্তন দরকার নেই। ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই শুরু করা যায়। যেমন, কোনো জিনিস কেনার আগে ভেবে দেখা যায়, সেটি সত্যিই প্রয়োজন কি না। কেবল অন্যের কাছে আছে বলে একই জিনিস কেনার দরকার নেই। পুরোনো জিনিসটি ভালো থাকলে সেটি আরও কিছুদিন ব্যবহার করা যায়। এতে টাকা বাঁচে, অপ্রয়োজনীয় জিনিসও জমে না।
সময় ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লাগোমের ধারণা কাজে লাগতে পারে। সারাদিন পড়াশোনা বা কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়া যেমন ভালো নয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে কেবল বিনোদনে সময় কাটানোও ঠিক নয়। কাজের ফাঁকে বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো দরকার। এতে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে, শরীর ও মনও ভালো থাকে।
নিজের চাহিদা ও সামর্থ্য বুঝে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। কারও ঘরে অনেক আসবাব থাকতে পারে, আবার কারও ঘরে থাকতে পারে অল্প কয়েকটি। কিন্তু আসবাবের সংখ্যা দিয়ে আনন্দের পরিমাণ মাপা যায় না। দরকারি আসবাব দিয়ে বাসাটা সুন্দর করে সাজানো যায়, তাতেই আনন্দ। তাই সব সময় আরও বেশি পাওয়ার কথা না ভেবে, যা আছে তা দিয়ে কীভাবে সুন্দর সময় কাটানো যায়, সেটিও ভাবা দরকার।
সবচেয়ে বড় কথা, অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে না করা। কারও কাছে বেশি টাকা থাকতে পারে, কেউ হয়তো কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যায়, আবার কারও অনেক গাড়ি-বাড়ি আছে। তবে প্রত্যেকের পরিস্থিতি আলাদা। অন্যের ভালো দিক দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া যায়, কিন্তু সব সময় নিজেকে তার সঙ্গে তুলনা করলে নিজের ভালো দিকগুলো চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া এবং ছোট ছোট অর্জনেও আনন্দ খুঁজে নেওয়া জরুরি।
লাগোমের শিক্ষা খুব সহজ, জীবনে সবকিছু বেশি করে পাওয়াই সাফল্য নয়। কখন থামতে হবে, কতটুকু যথেষ্ট এবং যা আছে তার যত্ন কীভাবে নিতে হবে সেটিও জানা দরকার। নিজের প্রয়োজন বোঝা, অন্যের কথা ভাবা, অপচয় কমানো এবং জীবনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করার মধ্য দিয়েই এই দর্শনের চর্চা করা যায়। সহজ ভাষায়, সব চাওয়া পূরণ না হলেও জীবন সুন্দর হতে পারে, আর সেটাই হলো লাগোম।
সূত্র: ভোগ ম্যাগাজিন, বিগ থিঙ্ক, ভিজিট সুইডেন
