সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত সংস্থাটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত সংস্থাটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও এর প্রভাব কেবল যাত্রী পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের জীবিকা, পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহের প্রশ্ন। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দীর্ঘায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে সেই মানুষগুলোকে, যাদের শ্রমে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতিনিয়ত শক্তি সঞ্চয় করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সৌদি আরবের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, গৃহকর্ম, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন সেবা খাতে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো অর্থে দেশের অসংখ্য পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা এবং আবাসনের ব্যয় নির্বাহ হয়। জাতীয় অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রার জোগানেও তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথম ও প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত যুদ্ধ বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমিত করা। কোনো সংঘাতই সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার নৈতিক বৈধতা দিতে পারে না। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব, কিন্তু এর পরিণতি বহন করেন সাধারণ মানুষ। বিশেষত, প্রবাসী শ্রমিকেরা এমন এক সংকটের মুখোমুখি হন, যেখানে তাদের নিজেদের কোনো ভূমিকা না থাকলেও নিরাপত্তাঝুঁকি, যাতায়াতের বাধা এবং কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা একসঙ্গে দেখা দেয়। তাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান হওয়া উচিত সুস্পষ্ট: অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে যুদ্ধবিরতি, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তার পক্ষে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন। বিমানবন্দর ও আকাশপথের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতির গুরুতর দিকগুলোর একটি। এক্ষেত্রে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মাধ্যমে শ্রমিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কোনো এলাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে শ্রমিকদের করণীয়, নিরাপদ আশ্রয়, জরুরি যোগাযোগের নম্বর এবং প্রয়োজনে স্থানান্তরের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। যাঁরা অসুস্থ, আহত, কর্মহীন কিংবা নিয়োগকর্তার সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু তাঁদের শারীরিক সুরক্ষা নয়; তাঁদের চাকরি, বেতন, আবাসন এবং আইনগত অধিকার রক্ষাও এর অন্তর্ভুক্ত। সংঘাতের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হলে শ্রমিকেরা যেন বিনা কারণে চাকরিচ্যুত না হন, তা নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। যেসব শ্রমিকের বেতন বকেয়া রয়েছে, যারা কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না অথবা যাঁদের চুক্তির মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাঁদের সমস্যাগুলো পৃথকভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য দূতাবাসের অধীনে একটি কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু রাখা যেতে পারে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক ছুটি কিংবা অন্য প্রয়োজনে দেশে এসে আটকে পড়েছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় তাঁরা নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে ফিরতে না পারলে অনেকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। কেউ হয়তো দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ব্যয় করে দেশে এসেছেন; কেউ পরিবারের সঙ্গে অল্প সময় কাটিয়ে আবার কর্মস্থলে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের পক্ষে ফ্লাইট বন্ধ থাকার মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অথচ কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণে চাকরি বাতিল হলে কিংবা পুনরায় প্রবেশে জটিলতা সৃষ্টি হলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হবে, পাশাপাশি নতুন করে বিদেশে যাওয়ার খরচ ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, নিয়োগকর্তা এবং বিমান চলাচলসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের জন্য বিশেষ প্রত্যাবর্তন-ব্যবস্থা, প্রবেশের অনুমতির মেয়াদ বৃদ্ধি, ইকামা ও কাজের অনুমতির নবায়ন কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
