মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ বৈধ পথে দেশে আনা সহজ করতে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) মাধ্যমে মালদ্বীপের মুদ্রা রুফিয়ায় রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা, ভ্রমণ ব্যয়ে দেশটির স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ এবং দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাই। এ বিষয়ে মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির (এমএমএ) গভর্নর আহমেদ মুনাব্বারকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের একটি যৌথ প্রতিনিধি দলকে মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে এ বৈঠক আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্যতম বড় সমস্যা হলো স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া বিনিময়। দেশটির ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি রুফিয়া গ্রহণে আগ্রহী না হওয়ায় প্রবাসীদের খোলাবাজার থেকে রুফিয়া দিয়ে মার্কিন ডলার কিনে পরে ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে হয়। এর সঙ্গে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে বাড়তি কমিশনও দিতে হচ্ছে তাদের। ফলে ডলার কেনা ও দেশে টাকা পাঠানো— দুই ধাপেই অতিরিক্ত খরচের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রবাসী কর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে রুফিয়া থেকে সরাসরি বাংলাদেশি টাকায় রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ তৈরির দাবি উঠেছে। গত মাসে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, মালদ্বীপে কর্মরত প্রায় এক লাখের বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে ধাপে ধাপে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। তিনি প্রবাসীদের দুর্ভোগ কমাতে চারটি প্রস্তাব দেন। এগুলো হলো— মালদ্বীপের রুফিয়া থেকে সরাসরি বাংলাদেশি টাকায় রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা চালু, দেশটিতে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা বা এক্সচেঞ্জ হাউস কিংবা এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু, স্বীকৃত মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ ও বৈধ রেমিট্যান্স করিডোর তৈরি এবং মুদ্রা বিনিময়ের কনভার্শন ফি ও প্রণোদনার বিষয়টি স্বচ্ছ করা। তার ওই অভিযোগ ও প্রস্তাবের পরই মালদ্বীপ থেকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনা সহজ করার উদ্যোগ নিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আমাদের সময়কে
বলেন, মালদ্বীপে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকা কাম্য নয়। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে পারেন, সেটিই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা-ও বিবেচনা করবে।
গত ৮ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উল্লেখ করেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার সংস্কার এবং বৈধ মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন জোরদারে মালদ্বীপ সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ। তবে এসব উদ্যোগের পরও মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিদের দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধান হয়নি। এ পরিস্থিতিতে উভয় দেশের আইন ও বিধিবিধান মেনে নিরাপদ, দক্ষ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির সঙ্গে আলোচনা করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান, কার্যক্রম পরিচালনা এবং অর্থ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে। পারস্পরিক সমঝোতা ও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স চ্যানেলের ব্যবহার আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে।
রুফিয়ায় রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রস্তাব : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম প্রস্তাব হলো, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) আওতায় উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করে মালদ্বীপের মুদ্রা মালদ্বীভিয়ান রুফিয়া (এমভিআর) ব্যবহার করে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ দেওয়া। এ জন্য মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিরা স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ পাঠাতে পারবেন। পরে বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সেই অর্থ রেমিট্যান্স গ্রহীতাদের কাছে বাংলাদেশি টাকায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে মালদ্বীপের মুদ্রা থেকে ডলারে রূপান্তর করে অর্থ পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা কমানো বা লেনদেনের প্রক্রিয়া সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে, তা দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
ভ্রমণ ব্যয়েও ব্যবহার হতে পারে রুফিয়া : দ্বিতীয় প্রস্তাবে মালদ্বীপে ভ্রমণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের যোগ্য ভ্রমণসংক্রান্ত খরচ মেটাতে দেশটির মুদ্রা রুফিয়া ব্যবহারের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। বৈধ রেমিট্যান্স চ্যানেলের মাধ্যমে মালদ্বীপে সংগৃহীত রুফিয়ার তহবিল কাজে লাগিয়ে দেশটির লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক ও মানি ট্রান্সফার অপারেটরগুলোর (এমটিও) মাধ্যমে এ ধরনের অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো ভ্রমণকারীদের জন্য টাকায় মূল্য নির্ধারিত কার্ড ইস্যু করতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থের নিষ্পত্তি বা সেটেলমেন্ট হবে পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণের আওতাধীন ব্যবস্থায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে দুই দেশের মধ্যে বৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মালদ্বীপে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আসা স্থানীয় মুদ্রার তহবিল ব্যবহারের নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে এটি এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময়ের সম্ভাবনা যাচাই : তৃতীয় প্রস্তাবে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা মালদ্বীপ থেকে অর্জিত রেমিট্যান্স দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে ভূমিকা রাখতে পারে। কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমে দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে নির্ধারিত শর্তে মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত কাঠামো বা বাস্তবায়নের সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। প্রস্তাবটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে মালদ্বীপের কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রেরণে ১৮তম : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মালদ্বীপ থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫ হাজার ডলার। এর মধ্যে জুলাইয়ে ৯৯ লাখ ২০ হাজার, আগস্টে ৭৬ লাখ এবং সেপ্টেম্বরে ২ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অর্থাৎ, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপের অবস্থান ছিল ১৮তম। তবে চলতি অর্থবছরে বাড়লেও গত অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আসা কমেছিল প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। গত অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলার।
