কক্সবাজারের পেকুয়ায় নির্মাণের প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত উপজেলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কমপ্লেক্সের তালা খোলা হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির চারপাশে আগাছা-ঝোপঝাড় জন্মেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনের আশপাশ এখন গবাদিপশুর বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে। সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়নের বারবাকিয়া বাজার এলাকায় উপজেলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হয়। বারবাকিয়া বাজারের মডেল মসজিদের পাশে নির্মিত কমপ্লেক্সটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর কমপ্লেক্সটি মুক্তিযোদ্ধাদের সভা-সমাবেশ, সাংগঠনিক কার্যক্রম, মতবিনিময় ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ভবনের চারপাশ আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটির পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের কিছু সরঞ্জাম ও উপকরণ নষ্ট হচ্ছে। এমনকি কিছু মালামাল খোয়া যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সভা, সাংগঠনিক কার্যক্রম, মতবিনিময় ও বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের প্রয়োজন হয়। এসব কার্যক্রমের জন্য আলাদা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলেও সেটি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। ফলে অনেক সময় কমিউনিটি সেন্টার, রেস্টুরেন্ট কিংবা ভাড়া করা অন্য স্থানে সভা-অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত স্থাপনাটির মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
পেকুয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রমিজ উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাদুঘর কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় ছিল। কিন্তু নির্মাণের পর একদিনের জন্যও এটি খোলা হয়নি। দিনের পর দিন তালাবদ্ধ থাকলে আমরা এর সুফল পাব কোথায়?’
তিনি আরও বলেন, ‘বেশ কয়েকবার উপজেলা প্রশাসনের কাছে কমপ্লেক্সটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে কমপ্লেক্সের অনেক কিছু খোয়া গেছে। যেগুলো রয়েছে, সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ভবনটি খুলে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারের উপযোগী করা প্রয়োজন।’
আরেক মুক্তিযোদ্ধা নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমাদের সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের প্রয়োজন হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণের জন্য নির্মিত জাদুঘর কমপ্লেক্স থাকা সত্ত্বেও সেখানে আমরা যেতে পারছি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জাদুঘর কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হলেও নির্মাণের পর থেকেই এটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রশাসনের যথাযথ উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিনেও কমপ্লেক্সটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি উপজেলা বিএনপির দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থাপন করে দ্রুত কমপ্লেক্সটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কমপ্লেক্সটির তালা খোলা কিংবা হস্তান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হওয়ার পর এটি এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার বদলির কারণে কমপ্লেক্সটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর মাধ্যমে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে পেকুয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের মাধ্যমে কমপ্লেক্সটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
