- আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৮:২৬:৪৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৮:২৬:৪৩ পূর্বাহ্ন
দিরাইয়ে মেয়েদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থগিতের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গানের অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে আপত্তি এবং তা বন্ধের উদ্যোগ নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই প্রশ্ন তোলা জরুরি - কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকলেই কি তা বন্ধ করে দিতে হবে? ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মতের ভিত্তিতে অন্যের সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার অধিকার সীমিত করার প্রবণতা কি একটি বহুত্ববাদী সমাজের জন্য ইতিবাচক? গত ৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তির মুখে স্থগিত হয়। এর কয়েক দিনের মাথায় হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে গানের অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে আপত্তি ওঠে। অনুষ্ঠান বন্ধের দাবিতে দুই বাসিন্দা থানায় লিখিত আবেদন করেন। পরে পুলিশের সঙ্গে আলোচনায় আয়োজকেরা গান-বাজনা না করার আশ্বাস দিলে বিষয়টির মীমাংসা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। দুটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন রয়েছে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মতো স্বাভাবিক আয়োজন কেন বারবার আপত্তি ও বিরোধের মুখে পড়বে? বিশেষ করে মেয়েদের খেলাধুলা কিংবা নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি ওঠার বিষয়টি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি নাগরিকের সাংস্কৃতিক জীবনেও রয়েছে স্বাভাবিক অংশগ্রহণের অধিকার। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে পর¯পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো উচিত নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের অধিকার ও পছন্দের প্রতি সম্মান দেখানোও সভ্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে স্থানীয় মানুষের আপত্তি থাকতেই পারে। আয়োজনের ধরন, শব্দদূষণ, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু কেবল ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা কোনো গোষ্ঠীর অসম্মতির কারণে একটি আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে না। আপত্তির যৌক্তিকতা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই হওয়া উচিত প্রশাসনের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইন, নাগরিক অধিকার ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে আয়োজকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে কোনো আয়োজন জনদুর্ভোগ বা অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনার কারণ না হয়। দিরাইয়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি, লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বসবাস করছেন। এই ঐতিহ্য রক্ষার অর্থ নতুন প্রজন্মের খেলাধুলা, গান কিংবা সৃজনশীল কর্মকা-ের পথ সংকুচিত করা নয়। বরং পার¯পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সংলাপের মধ্য দিয়ে সব পক্ষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই প্রকৃত সামাজিক দায়িত্ব। আমরা চাই, দিরাইয়ের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে বিভাজন নয়, ইতিবাচক আলোচনা শুরু হোক। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান থাকবে, আবার মেয়েদের মাঠে নামা, শিল্পীদের গান গাওয়া এবং মানুষের সুস্থ বিনোদনের অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে। কোনো গোষ্ঠীর আপত্তি যেন অন্যের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার না হয়। খেলাধুলা ও সংস্কৃতির অবাধ, নিরাপদ এবং দায়িত্বশীল চর্চা নিশ্চিত করতে সমাজ ও প্রশাসন - উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স

সম্পাদকীয়