বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শহর রংপুরে অবস্থিত হস্তশিল্প ও টেক্সটাইল কারখানা 'গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি' স্থাপত্যকলা ও ভবন ডিজাইনের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মাননা 'রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ' অর্জন করেছে। যুক্তরাজ্যের দ্য রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (আরআইবিএ) কর্তৃক প্রদান করা বিশ্বখ্যাত এই পুরস্কার জিতে নিয়ে কারখানাটি 'বিশ্বের সেরা নতুন ভবনের' স্বীকৃতি লাভ করল। রিবার বিচারকমণ্ডলী স্থাপত্যটির প্রশংসায় এটিকে ‘শান্ত ও বিনম্রতার এক অনন্য কর্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) আলমনগরের রবার্টসনগঞ্জে অবস্থিত সাততলা বিশিষ্ট এই হস্তশিল্প টেক্সটাইল কারখানাটি এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। শান্ত ও সুনিবিড় উঠোন, পুকুরের ধারে হেঁটে চলার পথ এবং ভবনের সম্মুখভাগে থোকা থোকা ট্রপিক্যাল উদ্ভিদের উপস্থিতি ভবনটিকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। বিচারকদের মতে, কারখানার ল্যান্ডস্কেপ বাগান, সবুজ বারান্দা এবং গাছে ঘেরা মূল দেয়াল কর্মক্ষেত্রে সরাসরি প্রকৃতিকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশি স্থপতি প্রতিষ্ঠান ‘নকশাবিদ আর্কিটেক্টস’ প্রকল্পটির মূল নকশা তৈরি করেছে। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি গৃহস্থালির শান্ত পরিবেশ, যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে উঠোন ও ছোট জলাশয় বা পুকুর, তা থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে কারখানার এই বিশেষ নকশা প্রণয়ন করা হয়।
কারখানাটিতে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কর্মী কাজ করেন, যাদের সিংহভাগই নারী। রিবা পুরস্কারের ক্ষেত্রে সাধারণত কেবল দর্শনীয় স্থাপত্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বরং সমাজের ওপর এর প্রভাবকেও বিবেচনা করা হয়। শ্রমিকদের কল্যাণকে কেন্দ্র করে নকশা প্রণয়ন করায় রিবার বিচারকমণ্ডলী প্রকল্পটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। শ্রমিকদের জন্য কারখানাটিতে বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভবনের ছাদে শিশুদের যত্নের জন্য ডে-কেয়ার বা দিবাযত্ন কেন্দ্র, প্রাঙ্গণেই সুসজ্জিত চিকিৎসাকেন্দ্র এবং কাজের ফাঁকে সামাজিক মেলামেশার জন্য তৈরি করা সুশীতল ছায়াযুক্ত স্থান। এছাড়া মূল প্রবেশদ্বারে বসানো হয়েছে একটি বিশাল 'বনলতা' নারীমূর্তি, যা স্থপতিদের মতে 'নারী ক্ষমতায়নের শক্তির' প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বিচারকমণ্ডলী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরেজমিনে কারখানাটি পরিদর্শন করেন। তারা লক্ষ্য করেন, কাজের সময় পার হয়ে গেলেও কর্মীরা পরিবার নিয়ে কারখানার এসব সুযোগ-সুবিধা ও প্রাঙ্গণ উপভোগ করেন। রিবা জানিয়েছে, এটি প্রথাগত কারখানা নকশা ও পরিচালনায় একটি যুগান্তকারী 'বিকল্প মডেল' উপহার দিয়েছে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মতো অতীত ঘটনার কথা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের কর্ম পরিবেশ নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু সেই প্রথার ঠিক বিপরীতে হেঁটে 'গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি' শ্রমিকদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস বা ভেদাভেদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।
বিচারকমণ্ডলীর প্রধান বিজয় জৈন কারখানার বড় কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটির প্রশংসা করে একে একটি ‘সমতার অংশীদারিত্বমূলক প্রবেশদ্বার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশে সাধারণত বড় বড় কারখানায় মালিক বা উর্ধতন কর্মকর্তা ও সাধারণ শ্রমিকদের প্রবেশের পথ আলাদা থাকলেও, এখানে পদের বা মর্যাদার কোনো বৈষম্য ছাড়াই একই প্রধান সিঁড়ি ও প্রবেশপথ ব্যবহার করে সাধারণ শ্রমিক, ম্যানেজার এবং কারখানার মালিকেরা যাতায়াত করেন।
নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজীদ এম. খন্দকার বলেন, আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে শিল্পকারখানাও শ্বাস নিতে পারে, মানুষকে লালন করতে পারে এবং অনুপ্রাণিত করতে পারে। আমরা নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন তুলেছিলাম—একটি কারখানাকে যদি শুরুতেই সেখানে কাজ করা মানুষগুলোর 'ঘর' হিসেবে নকশা করা হতো, তবে কেমন হতো? প্রতিটা উঠোন, বাগান, জলাশয় ও ছায়াযুক্ত বারান্দার ধারণা এই একটি প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে। কারখানা কোনো মানুষের শক্তি শুষে নেওয়া যন্ত্র হওয়া উচিত নয়; বরং এটি হওয়া উচিত এমন এক জীবন্ত স্থান, যা সেই শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করে।
সাততলাবিশিষ্ট এই আধুনিক শিল্পকারখানার চারতলাজুড়ে তৈরি হয় হস্তশিল্পের চমৎকার কার্পেট ও নান্দনিক টেক্সটাইল সামগ্রী। বাকি তলাগুলোতে চলে প্যাকেজিং ও গুদামজাতকরণের কাজ। কারুশিল্প প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড’ এই কারখানাটি পরিচালনা করে, যারা প্রধানত হস্তনির্মিত কার্পেট, ডোরম্যাট ও বাথম্যাট তৈরি করে থাকে। কারখানাটির নির্মাণকাজ ২০১৭ সালে শেষ হলেও অতিমারিসহ নানা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে রিবার বিচারকমণ্ডলী ২০২৬ সালের আগে সরেজমিনে দেখার সুযোগ পাননি।
২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া 'রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ' একক কোনো ভবনের জন্য প্রদত্ত বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক স্থাপত্য পুরস্কার। বিশ্বব্যাপী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত চারটি ভবনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প জায়গা করে নিয়েছিল। এর মধ্যে একটি ঢাকার জলবায়ু-বান্ধব 'ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়' ভবন এবং অপরটি এই বিজয়ী 'গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি'। বেলজিয়ামের দুটি বিশ্বমানের স্থাপনাকে পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের এই সৃষ্টিশীল সবুজ কারখানাটি বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয়।
সূত্র: সিএনএন / দ্য রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস
