সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের নানা পৌরাণিক কাহিনি ও সনাতন ধর্মের ইতিহাস তুলে ধরতে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার দুটি মন্দিরে তৈরি করা হয়েছে ৩৫৩টি প্রতিমা। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ব্যতিক্রমী এ আয়োজন ঘিরে এরই মধ্যে ভিড় করতে শুরু করেছেন দর্শনার্থীরা। প্রতিমার মাধ্যমে ধর্মীয় উপাখ্যান, দেবদেবীর লীলা এবং মানবসেবার নানা কাহিনি তুলে ধরেছেন আয়োজকেরা।
উপজেলার মিকশিমিল এলাকার খরসংঘ কালার বটতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে দুর্গাপ্রতিমার পাশাপাশি স্থান পেয়েছে ২০১টি প্রতিমা। এর প্রায় ৫০০ গজ দূরে মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে তৈরি করা হয়েছে আরও ১৫২টি প্রতিমা। দুই মন্দিরের এ আয়োজন দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খরসংঘ কালার বটতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে মহাভারত, বেদ, গীতা, পুরাণ ও রামায়ণসহ সনাতন ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন কাহিনি প্রতিমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজা হরিশচন্দ্রের জীবনের পরিণতি, শ্রীকৃষ্ণের বকাসুর বধ, নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচার, হরিচাঁদ ঠাকুরের মানবসেবা এবং রামচন্দ্রের বনবাসের কাহিনি।
খুলনা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মন্দিরটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ প্রতিমা। কোথাও ক্ষীরসাগরে অনন্তশয্যায় মহাবিষ্ণু, আবার কোথাও নাগদেবীর ছায়ায় তাঁর অবস্থান। রয়েছে ভগীরথের গঙ্গা আনয়নের কাহিনি, রাজা হরিশচন্দ্রের চণ্ডালজীবন, অহল্যার পাষাণমূর্তি, রামচন্দ্রের বনবাস, পাদুকা দিয়ে রাজ্য শাসন এবং রাবণের সীতা হরণের দৃশ্য।
মন্দিরের অন্য অংশে রয়েছে হনুমান ও ভীষ্মের প্রতি মহামায়ার উপদেশ, শ্রীকৃষ্ণের মাখন চুরি এবং বকাসুর বধের কাহিনি। পাশাপাশি প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে অতীতে নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর উচ্চবর্ণের মানুষের নির্যাতনের চিত্র। গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির হরিচাঁদ ঠাকুর ও অস্ট্রেলীয় নাগরিক ড. সি. এস. মিডের সমাজসেবা এবং শিক্ষাবিস্তারে অবদানের কাহিনিও স্থান পেয়েছে এ আয়োজনে।
খরসংঘ কালার বটতলা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার বলেন, ধর্মীয় উপাখ্যান ও ইতিহাসের নানা দিক প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা এসব প্রতিমা দেখে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন কাহিনি সম্পর্কে জানতে পারবেন।
অন্যদিকে, মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরেও রয়েছে নানা পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর প্রতিমা। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ২০ ফুট উচ্চতার হনুমানের বিগ্রহ। মন্দির প্রাঙ্গণে স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে সনাতন ধর্মবিষয়ক সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক ভাষণের দৃশ্য।
মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ অপু সাহা বলেন, মন্দিরে নয়টি রূপে দুর্গার প্রতিমা, রাধাকৃষ্ণের যুগল মিলন, ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন ও তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্ধারের কাহিনি, দেবী দুর্গার রক্তবীজ বধ এবং মা কালীর সঙ্গে রামপ্রসাদের নানা উপাখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ২০ ফুট উচ্চতার রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের প্রতিকৃতি।
তিনি আরও বলেন, মন্দিরের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১৫২টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিমা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসছেন। অনেকে এসব দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে রাখছেন।
এদিকে দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্যাপনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও পুলিশ প্রশাসন।
খুলনা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিমান সাহা বলেন, পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা, উপজেলা ও মন্দিরভিত্তিক পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্যাপনে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলার নয়টি উপজেলায় পূজা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া পুলিশ সুপারের মুঠোফোন নম্বর-সংবলিত ব্যানার টাঙানো হবে এবং সক্রিয় থাকবে নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
উল্লেখ্য, এ বছর খুলনায় মোট ১ হাজার ১১টি মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি উপজেলায় ৮৮৭টি এবং মহানগরের আটটি থানায় ১২৪টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
ইএন/এসএ
