রাশিয়া ও ইউক্রেন জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (১১ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ ঘোষণা দেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ট্রাম্পের পোস্ট থেকেই তিনি প্রথম এ চুক্তির কথা জেনেছেন।
ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে লেখেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। কেউ যেন এ চুক্তি ভঙ্গ না করে।
তবে ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রাশিয়া সম্মত হলে ইউক্রেনও এ ধরনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি আছে। এর আগে রোববার জেলেনস্কি বলেছিলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেন প্রস্তুত, তবে মস্কোকেও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে কার্যকর নিশ্চয়তা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ইউরোপে যুদ্ধের মূল কারণ রাশিয়া। আজই জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তা চান না।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ইউক্রেন যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সে সময় কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এমন চুক্তিতে সম্মত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
জেলেনস্কিকে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান ট্রাম্পের
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শনিবার ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলে জেলেনস্কিকে ক্ষমতা ছাড়তে এবং নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা বেছে নিতে ইউক্রেনীয়দের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রোববার এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করবেন তিনি। তবে দেশের নেতা কে হবেন, তা ইউক্রেনের জনগণই ঠিক করবেন বলে মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। তাঁর মতে, নির্বাচন আয়োজনের আগে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া জরুরি। নিরাপত্তার কারণে ইউক্রেনের আইনে সামরিক আইন চলাকালে নির্বাচন নিষিদ্ধ।
জেলেনস্কি বলেন, পুতিনকে দুই মাসের জন্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে বলা হোক, যাতে এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা যায়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরোধিতা
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে। আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তবে জেলেনস্কি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলেছে।
শনিবার রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত একটি চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি বলেন, এ ধরনের চুক্তি মস্কোকে ইউক্রেনে হামলা বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে এবং এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তিতে জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে কমার সম্ভাবনা কম। কারণ, চুক্তির আওতায় সরবরাহের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি ডন বেকনসহ কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতাও এ চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল না করে আরও কঠোর করা উচিত।
ট্রাম্পের মন্তব্যে ক্ষোভ কিয়েভবাসীর
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নতুন নেতা নির্বাচনের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কিয়েভের কয়েকজন বাসিন্দা। সাবিনা নামে ৪০ বছর বয়সী এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা বলেন, ইউক্রেনের জনগণকে কী করতে হবে, তা বলার অধিকার কারও নেই। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় যখন নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়, তখন এমন মন্তব্যকে তিনি মিত্রদের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন।
এদিকে রোববার ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলেনস্কি। রাশিয়ার ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানের গোলাবারুদসহ অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রতিদিন আলোচনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সোমবার ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক কাউন্সিলের বৈঠকে অংশ নেবেন। বৈঠকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের সদস্যপদ লাভের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/
