জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় সাতজনকে হত্যার পর ছয়জনের মরদেহ পোড়ানোর মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
গত ১৩ অক্টোবর সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে তিনি মুক্তি পান বলে কারাগারটির ডেপুটি জেলার মো. আফতাবুজ্জামান জানিয়েছেন।
সোমবার তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেইলবন্ড আসার পর আমরা গোয়েন্দা, ঢাকার প্রসিকিউশন, ঢাকার এসপি অফিস, গাজীপুরের ডিসি প্রসিকিউশন, গাজীপুর ইউএসবি ও সিটিএসবি—সব জায়গায় মেসেজ দিয়েছি। সব জায়গা থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি।”
রায়ের পর মুক্তি পেতে আট মাস দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডেপুটি জেলার বলেন, “আবজালুল ট্রাইবুন্যালের মামলায় আগেই রিলিজ হয়েছিলেন। কিন্তু আশুলিয়া থানার অন্য এক মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি সেসময় কারামুক্ত হননি। পরে বিচারাধীন সে মামলায় জামিন পাওয়ায় এখন কারামুক্ত হলেন।”
ট্রাইব্যুনালের রায়
গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আশুলিয়ায় হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ পোড়ানোর মামলার রায় ঘোষণা করে।
ওই রায়ে সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য পাঁচজন হলেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদ রনি, এসআই আবদুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, কনস্টেবল মুকুল চোকদার এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূইয়া।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন হলেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস এবং ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন।
এ ছাড়া এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, “এসব অপরাধের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া ছিল না; জনসাধারণের মনে চরম আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করা, ভিন্নমত দমন করা এবং ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে আধিপত্য টিকিয়ে রাখাও এর উদ্দেশ্য ছিল।”
রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ১৫ ধারার বিধান অনুযায়ী, শেখ আবজালুল হক এ মামলায় রাজসাক্ষী বা ‘অ্যাপ্রুভার’ হন। এ ধারায় অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি নিজের জানা ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও সত্য তথ্য প্রকাশের শর্তে ক্ষমা পেতে পারেন।
রাজসাক্ষীকে বিচার চলাকালে সাক্ষ্য দিতে হয় এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত হেফাজতে রাখার বিধান রয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ আগস্ট আবজালুল হক ট্রাইব্যুনালে নিজের দোষ স্বীকার করে পূর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশের শর্তে ক্ষমা চেয়ে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়।
পরে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মামলার ২৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় শহীদ পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চান আবজালুল। একই সঙ্গে দাবি করেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশের মুখে তার ‘কিছু করার ছিল না’।
জবানবন্দিতে আবজালুল বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আশুলিয়া এলাকায় ছাত্র-জনতা বিজয় মিছিল বের করেন। মিছিলটি থানার দিকে এলে তৎকালীন ওসি সায়েদের নির্দেশে বিশ্বজিৎ সাহাসহ আরেকজন গুলি করেন।
জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন মামলার আসামি আব্দুল্লাহিল কাফীর আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান।
জেরায় আবজালুল বলেন, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা এসআই আউয়ালের কাছে তিনি অস্ত্র ও গুলি জমা দেন। ৫ অগাস্ট তার নামে ইস্যু করা ১০টি গুলিও জমা দেন।
জেরায় তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৪ অগাস্ট পর্যন্ত তিনি ‘ট্রমায়’ ছিলেন। ১৫ অগাস্ট অস্ত্র জমা দিতে এসে আশুলিয়া থানা এলোমেলো অবস্থায় দেখেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় পুলিশ সদস্য হিসেবে রাজসাক্ষী হন আবজালুল।
আবজালুলের জেরা ঘিরে এজলাসে উত্তাপ
আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে রাজসাক্ষী আবজালুলকে জেরার একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান জানতে চান, থানায় এসে এএসআই রাজু আহমেদের মারা যাওয়ার কথা আবজালুল শুনেছিলেন কি না।
এ প্রশ্নের বিরোধিতা করে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, রাজসাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে, তবে এ ধরনের প্রশ্ন করা যাবে না।
জবাবে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, একজন দারোগাকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্ন করা যাবে না?
তিনি বলেন, প্রসিকিউশন যেমন একজন মায়ের আবেদনের বিচারের জন্য এসেছে, এটিও নিহত পুলিশ সদস্য রাজুর স্ত্রীর আবেদন।
এ পর্যায়ে প্রসিকিউটর জানতে চান, আসামিপক্ষের আইনজীবী যে নথি এনেছেন, তা দেখানোর অনুমতি আছে কি না এবং ট্রাইব্যুনালে সাফাই সাক্ষীর তালিকা দেওয়া হয়েছে কি না।
জবাবে মিজানুর রহমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে ‘গুম’ হওয়া সুখরঞ্জন বালির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সাফাই সাক্ষীর নাম দিলে হুমকি দেওয়া শুরু হয়।
এ বাদানুবাদ ও উচ্চ স্বরে বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে, সাক্ষ্য নিতে গেলেই এত কাহিনি শুরু হয়।
বিচারকেরা দুই পক্ষকেই ট্রাইব্যুনালের পরিবেশ বজায় রাখার অনুরোধ জানান এবং আইনকে আইন অনুযায়ী প্রয়োগের নির্দেশ দেন।
উপরে বাঁ থেকে সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়; নিচে বায়েজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন ও ওমর ফারুক।
যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড
মামলার নথিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় পুলিশ।
এতে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন।
পরে একজন জীবিত ব্যক্তি ও ছয়জনের মরদেহ একটি ভ্যানে স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
২০২৫ সালের ২ জুলাই ট্রাইব্যুনালে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ওই বছরের ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল।
