আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ANI
Published on
:
4 min read
অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
‘অজীব দাস্তাঁ হ্যায় ইয়ে, কহাঁ শুরু কহাঁ খতম’— সুনহেরি বাগে রাহুল গান্ধীর বাসভবনের লনে বাজতে থাকা এই গানের সঙ্গে কাজু–কিসমিস ভরা সামোসা এবং কেশর চা খেতে খেতে মঙ্গলবার বিকেলে ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের শীর্ষ নেতারা ভাবছিলেন, উত্সবের মরশুমে কী ভাবে জ্ঞানেশ–বিরোধী আন্দোলনকে আরও জোরদার করা যায়৷ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) হাত ধরা নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তি, অন্য দিকে এই তরুণ তুর্কিদের পাশে পেতে আগ্রহী বিরোধী শিবিরের অনেকেরই। সেই বৈঠকে অনেক আলোচনাতেও ঐকমত্যের দিশা পাননি বিরোধী নেতৃত্ব। কিন্তু বুধবার সকালে সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস এবং অজিঙ্ক শিন্ডেকে দিল্লি পুলিশ তিহাড় জেলে পাঠানোর কথা জানাতেই মুহূর্তে বদলে গেল ছবিটা৷
যন্তর মন্তরে পুলিশি ব্যারিকেড টপকে, জাতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দেওয়ার কারণে কেন তিন যুবককে তিহাড়ে পাঠানো হবে— সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তোলা এই প্রশ্নই একজোট করে দিল বিরোধী শিবিরকে৷ তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, আম আদমি পার্টি (আপ)–এর অরবিন্দ কেজরিওয়াল— যুবসমাজের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারকে বিঁধলেন সবপক্ষই, আর এই সমর্থনের জন্য প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুললেন না সিজেপি–প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মঙ্গলবার ‘ব্লুমবার্গ ইকোনমিক ফোরাম’–এর মঞ্চ থেকে বলেছিলেন, ‘ভারত গণতন্ত্রের জননী। এই দেশে বিবিধ বিষয় নিয়ে লোকজন প্রকাশ্যে বিতর্ক করতে পারেন, ভিন্নমত নিয়ে স্বচ্ছন্দে চলে আলোচনা। এটাই ভারতের বিশেষত্ব।’ তবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) নিয়ে প্রতিবাদ–বিক্ষোভের মধ্যে সোমবারই যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি সোমবার নিষিদ্ধ করে সরকার। আর মঙ্গলবার সকালে আচমকাই যন্তর মন্তর চত্বরে পৌঁছে যান সৌরভ, রাঙ্কা, শিন্ডে–সহ আরও কয়েকজন।
পুলিশি ব্যারিকেড, লোহার গেট টপকে, নিয়মবিরুদ্ধ ভাবে যন্তর মন্তরের ভিতরে ঢোকার অভিযোগ ওঠে তাঁদের বিরুদ্ধে। বুধবার সকালে আদালতে তোলা হলে সৌরভ এবং আশুতোষকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, শুধু যন্তর মন্তরে বেআইনি ভাবে ঢোকা নয়, অশান্তি সৃষ্টির জন্য লোকজনকে সমবেত হওয়ার উস্কানিও দিয়েছিলেন সিজেপি নেতারা। সৌরভ, আশুতোষদের আইনজীবীর অবশ্য দাবি িছল, তাঁর মক্কেলরা কোনও জমায়েতের ডাক দেননি, নিজেরাও শান্তিপূর্ণ ভাবে তেরঙ্গা নিয়ে যন্তর মন্তরে ঢুকেছিলেন, কিন্তু সেই যুক্তি ধোপে টেকেনি।
বুধবারই ছিল আশুতোষের জন্মদিন। সে দিনই জেলে পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলে সরব হন সিজেপি–প্রতিষ্ঠাতা দীপকে। তাঁর দাবি, ‘যতদূর মনে পড়ছে, পাবলিক প্লেসে তেরঙ্গা ওড়ানোর জন্য গ্রেপ্তার করা হতো ব্রিটিশ আমলে। প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বলতে চাই, যদি দেশে জরুরি অবস্থা বলবৎ করতে চান, সেটা অফিশিয়ালি করুন। এমন কাপুরুষের মতো কাজ করছেন কেন? ১৯৭৫–এর ইর্মাজেন্সির সময়েও এমনটা ঘটেনি!’ ততক্ষণে বিরোধী দলগুলো থেকেও নিন্দা–বার্তা আসতে শুরু করে দিয়েছে। সিজেপির নাম না–করলেও এক্স হ্যান্ডলে রাহুলের পোস্ট, ‘যন্তর মন্তর ভারতের জনগণের। আমরা সেটা পুনরুদ্ধার করবই।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনও অপরাধ নয়। তার জন্য যুবকদের জেলে পাঠানো কাপুরুষোচিত কাজ। পড়ুয়া, তরুণ প্রজন্ম, সাংবাদিক, ‘ইন্ডিয়া’ ব্লক— ভিন্ন ভিন্ন ব্যানার হলেও লক্ষ্য একটাই। নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতেই পথে নামছেন সকলে।’ সৌরভদের তিহাড়ে পাঠানোর তীব্র নিন্দা করেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, ডিএমকে সুপ্রিমো এমকে স্ট্যালিন, আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও৷ আপ–সুপ্রিমোর প্রশ্ন, ‘নিজের দেশে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কি অপরাধ?’ স্ট্যালিন বলেন, ‘এই সরকার কত জন বিক্ষোভকারীকে আটক করবে? যত বেশি করবে, তত বেশি সাধারণ নাগরিক রাস্তায় নেমে জনগণের প্রকৃত শক্তি তুলে ধরবে!’
বিরোধী শিবিরের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং সার–বিরোধিতা প্রথম শুরু করেছিল কংগ্রেস। সূত্রের খবর, তাদের তোলা ইস্যু সিজেপি হাইজ্যাক করে নিক, সেটা চাননি রাহুল। তাই ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের বৈঠকে বামেদের তরুণ মুখ নেহা বোরাকে আমন্ত্রণ করা হলেও সিজেপি–র কেউ আমন্ত্রণ পাননি। এমনকী ১০ অক্টোবর সিজেপি–র ‘যন্তর মন্তর চলো’ অভিযানে বাকি বিরোধী দল সামিল হলেও হয়নি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে এ দিন যে ভাবে কারও নাম না–করেও সৌরভদের জেলে পাঠানোর নিন্দা করেছেন রাহুল, তাতে সিজেপি–র প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থনই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সিজেপি–র সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব কমছে৷ অদূর ভবিষ্যতে সিজেপি এবং ‘ইন্ডিয়া’র যৌথ আন্দোলন কর্মসূচিও সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা৷ মঙ্গলবার দীপকেও ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন— ‘বিজেপি বিভেদের রাজনীতি করছে, তাতে পা না দিয়ে সম্মিলিত ভাবে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ তাকে সঙ্গত করেই যেন এ দিন রাহুল বলেন— ‘ব্যানার যাই হোক, আন্দোলনটা একই!’ সেই সুরেই বুধবার দীপকের নয়া সংযোজন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি একটা স্বাধীন প্রেশার গ্রুপ৷ আমরা সেটাই থাকব৷ এর অর্থ এই নয় যে, আমরা ইন্ডিয়া ব্লকের বিরুদ্ধে৷ আমরা এবং ইন্ডিয়া ব্লক একই কারণে আন্দোলন করছি।’ রাহুল সুকৌশলে নেহাকে সামনে রেখে যুব–প্রজন্মের মধ্যে সিজেপির প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন— এই যুক্তিও খারিজ করেছেন দীপকে। সূত্রের দাবি, ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের মতোই সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার ব্লু প্রিন্ট তৈরি করছে সিজেপি–ও, তার জন্য যোগাযোগ করছে আপ, তৃণমূল, ডিএমকে-র সঙ্গেও৷
এ দিন ‘অত্যাচারিত’ যুব কংগ্রেস সদস্যদের সামনে রেখেও দিল্লি পুলিশকে একহাত নিয়েছেন রাহুল। সাংবাদিক বৈঠকে কেরলম থেকে পড়তে আসা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী, আথিরাকে দেখিয়ে রাহুলের দাবি, ‘দিল্লি পুলিশের মারে আথিরার এক কানের শ্রবণশক্তি চলে গিয়েছে। আগের বার আপনাদের দেখিয়েছিলাম, কী ভাবে দিল্লি পুলিশের পেলেট গান এক আন্দোলনকারীর দৃষ্টি কেড়েছে।’ তবে আথিরাকে ‘শেরনি’ সম্বোধন করে রাহুলের দাবি, ‘আঘাতের মুখেও সাহস হারাননি ইনি।’ আথিরার দাবি, রাজপথে ধর্না–প্রতিবাদের সময়ে দিল্লি পুলিশ যখন তাঁদের আটক করে, তখন বাসের মধ্যেই এক মহিলা কনস্টেবল বুট পায়ে লাথি মারতে থাকেন৷ তাঁর মুখে ও কানে লাথি মারা হয়৷ আরও এক ছাত্র বেধড়ক মারধরের অভিযোগ তুলেছেন। রাহুলের দাবি, পুরো ঘটনার ভিডিয়ো সংগ্রহ করে রাখছেন তাঁরা, পরে সব দোষীর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে৷ এই সাংবাদিক বৈঠক থেকেও রাহুলের হুঁশিয়ারি, ‘অমিত শাহজি, এটা ভারত। এখানে একটাই স্বর, একটাই প্রতিবাদ। সেই স্বরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আপনারা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, জ্ঞানেশ কুমার, অমিত শাহ, বাচ্চাদের উপরে হাত তোলা দিল্লি পুলিশ— কেউ ছাড় পাবেন না। শাস্তি হবে, হবে, হবেই...।’