জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই সুন্দরবনে প্রবেশ করেন হাজারো মানুষ। কেউ মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া সংগ্রহ করেন, আবার কেউ যান মধু ও গোলপাতা আহরণে। কিন্তু জীবিকার এই লড়াইয়ে তাদের প্রতিনিয়ত থাকতে হয় রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বনের নানা বন্যপ্রাণীর ঝুঁকির মধ্যে। কখনও কখনও বনের গভীরে মানুষের সঙ্গে বাঘের মুখোমুখি সংঘাত কেড়ে নেয় প্রাণ, তৈরি করে আতঙ্ক। সুন্দরবনের এই দীর্ঘদিনের সমস্যা মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি বিশেষ বেড়া নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। কর্মকর্তাদের আশা, এই বেড়া মানুষ ও বাঘের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এসব বেড়া স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ৪৪ কিলোমিটার এবং পশ্চিম বিভাগে ৩০ কিলোমিটার বেড়া রয়েছে। ধানসাগর, কৈখালী ও কৈলাশগঞ্জের মতো সংবেদনশীল এলাকায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে এই উদ্যোগ।
সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশের কথা বিবেচনায় রেখে তুলনামূলক হালকা, টেকসই ও সহজে স্থাপনযোগ্য নাইলনের বেড়া ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব বেড়া খুলে অন্য স্থানেও স্থাপন করা সম্ভব। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নাইলনের বেড়া বাঘের সামনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে। বেড়া দেখতে পেয়ে বাঘ অনেক ক্ষেত্রে পথ পরিবর্তন করে বনের ভেতরে ফিরে যায়। ফলে মানুষ ও বাঘের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা কমতে পারে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানান, মানুষ ও বাঘের সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে পাশাপাশি বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিতভাবে এসব বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনে মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে-কাঁকড়াশিকারিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে প্রবেশ করেন। এ সময় বাঘসহ বিভিন্ন হিংস্র বন্যপ্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কা থাকে। এসব আক্রমণ প্রতিরোধ এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত নাইলনের বেড়া ব্যবহার করা হচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক দীপন চন্দ্র দাসের দাবি, গত চার-পাঁচ বছরে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, ২০১৮ সালে সর্বশেষ লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এরপর এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি বলে তাদের দাবি।
তবে সংঘাত কমে যাওয়ার পেছনে নাইলনের বেড়ার ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো মানুষ। এ কারণে তাদের নিয়মিত প্রবেশ করতে হয় বাঘের বিচরণক্ষেত্রে। বনের ভেতরে অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান, রান্না করা, খাবার সংরক্ষণ এবং বনের সীমানার কাছাকাছি রাতযাপন- এসব পরিস্থিতিতে বনজীবীদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাঘের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি এবং মানুষের কার্যক্রমের কারণে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে দূরত্ব কমে আসাও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে। এই বাস্তবতায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বেড়া স্থাপন মানুষ ও বাঘের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবনে মানুষ ও বাঘের সংঘাত দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে ২০০০ সালের পরবর্তী প্রায় দুই দশকে মানুষ ও বাঘের সংঘাতে আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ এবং ৩৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বাঘের আক্রমণ ও মানুষ-বাঘ সংঘাতের ১৭২ থেকে ৩২৮টি ঘটনার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। এসব পরিসংখ্যানের আলোকে বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার
পাশাপাশি বাঘের অস্তিত্ব ও আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, মানুষ ও বাঘ- উভয়ের জন্যই সুন্দরবনের সুস্থ পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নাইলনের বেড়াকে মানুষ-বাঘের সংঘাত প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। বেড়া যথাযথভাবে স্থাপন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, যাতে বাঘসহ অন্য কোনো বন্যপ্রাণী এতে আটকে গিয়ে আহত না হয় এবং তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত না হয়।
এ ছাড়া বনজীবীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদে বনে প্রবেশের নিয়ম অনুসরণ, আগাম সতর্কবার্তা, নিয়মিত বন টহল এবং বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তন, বনজ সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং মানুষের জীবিকার প্রয়োজন- সব মিলিয়ে সুন্দরবনের সুরক্ষা এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাঘের আবাসস্থল অক্ষুণ্ন রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবনে ৭৪ কিলোমিটার নাইলনের বেড়া স্থাপন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি উদ্যোগ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বন্যপ্রাণীর ওপর এর প্রভাব পর্যবেক্ষণের ওপর। বনজীবীদের নিরাপত্তা ও বাঘের স্বাভাবিক বিচরণ- দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলেই এই উদ্যোগ মানুষ ও বাঘের নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করার পথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
