যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে 'নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা ও অযোগ্যতার' অভিযোগ তুলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শনিবার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের দুটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন ওবামা।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে ৬৫ বছর বয়সী ওবামা বলেন, 'বর্তমান প্রেসিডেন্ট একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি এমন একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা কেউ চায়নি।'
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি এসব কথা বলেন।
ওহাইওর ভোটারদের রিপাবলিকান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ওবামা বলেন, 'দুই বছর ধরে এমন বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি ও অযোগ্যতা দেখেছি, যা আধুনিক যুগে আগে কখনো দেখিনি। এবার আপনাদের বলার সুযোগ এসেছে, আর নয়।'
শনিবার সন্ধ্যায় মিশিগানে যান ওবামা। সেখানে সিনেট নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ এবং গভর্নর পদপ্রার্থী জোসেলিন বেনসনের পক্ষে প্রচার চালান তিনি।
ডেট্রয়েটের সমাবেশে আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির লাগাম টেনে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। তার ভাষায়, নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তত ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু 'বোকামি' নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ওবামা বলেন, 'নিজেদের অর্থে এমন প্রকাশ্য লুটপাটে কোনো প্রেসিডেন্টকে এতটা পারদর্শী হতে আমরা কখনো দেখিনি।'
তিনি আরও বলেন, 'সুবিধা বিক্রি করার ব্যাপারে এতটা আগ্রহী কোনো প্রেসিডেন্টকেও আমরা কখনো দেখিনি।' তার অভিযোগ, রিপাবলিকান পার্টি যেন 'দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার, অদক্ষ সরকার কিংবা সরকারহীনতার' প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়সংক্রান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিও উপহাস করেন ওবামা। তার মতে, এই যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বরং ইরানের প্রভাব বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলার ইরানি হুমকির কারণে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওবামা বলেন, 'বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল পৌঁছানোর জন্য যে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা হয়, এখন সেটির ওপর ইরানের কার্যত ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।'
ওহাইওর গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর প্রচার বিজ্ঞাপন নিয়েও কথা বলেন ওবামা। ওই বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের শৈশবের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ওবামা বলেন, 'সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমরা দেখেছি, তিনি এমন কোনো সীমা নেই, যা অতিক্রম করবেন না; এমন কোনো নিচু স্তর নেই, যেখানে তিনি নামবেন না। আচরণের মানদণ্ড এতটা নিচে নেমে গেছে যে কেউ এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে—এটা কীভাবে সম্ভব, তা আমি বুঝতে পারি না।'
বিজ্ঞাপনটিতে অ্যাকটনের মা ডোনা আর্থার তার মেয়ের শৈশবে গৃহহীনতা ও সৎবাবার যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা নিয়ে আপত্তি জানান। একই সঙ্গে তিনি ওহাইওর ভোটারদের মেয়েকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান।
অ্যাকটনের দাবি, ১৯৭৮ সালের পর থেকে মায়ের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। তার ভাইও শৈশবে সৎবাবার হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে অ্যাকটনের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। ২০০৪ সালে মারা যাওয়া ওই সৎবাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছিল।
অ্যাকটনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওবামা বলেন, তিনি তার কষ্টকর শৈশব এবং নির্যাতন, অবহেলা ও গৃহহীনতার অভিজ্ঞতা নিয়ে আবেগপূর্ণভাবে কথা বলেছেন।
সমাবেশে ওবামার সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অ্যাকটন এবং ওহাইওর সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন।
এদিকে শনিবার ফ্লোরিডায় আগাম ভোট দেওয়ার সময় রামাস্বামীর বিজ্ঞাপনের পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প।
মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদকে নিয়ে সমালোচনারও জবাব দেন ওবামা। তার অভিযোগ, ৪১ বছর বয়সী এই রাজনীতিককে হেয় করতে তার নাম ও মুসলিম পরিচয়কে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডেট্রয়েটের সমাবেশে ওবামা বলেন, 'আমরা আগেও এমন ঘটনা দেখেছি। সেই ঘটনার কেন্দ্রে আমিও ছিলাম। সেটা প্রমাণ করার জন্য আমার জন্মের পূর্ণাঙ্গ সনদও রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আবদুলের চেয়ে বেশি মিশিগানের মানুষ আর কেউ হতে পারে না।'
এল-সায়েদকে 'উগ্রপন্থী' বলে আখ্যা দেওয়ার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন সাবেক প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, 'আবদুলের মূল্যবোধ আমারই মতো।'
হোয়াইট হাউস ছাড়ার প্রায় এক দশক পরও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী প্রচারক হিসেবে রয়েছেন ওবামা। মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চাইছে দলটি। আগামী ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আগামী সপ্তাহে জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে ওবামার। সেখানে তার সঙ্গে থাকবেন সিনেটর জন অসফ এবং গভর্নর পদপ্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস। শনিবার একই অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্পও।
